আবু ছালেহ আতিফ
ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৪, ০১:০০ এএম
আসামি ফাঁসির হোক কিংবা যাবজ্জীবন। পরিবারের কাছে তারা হয়তো কোনো দিক থেকে নিরপরাধ। যদিও এ আবেগের জায়গা আইন-আদালতে নেই। অপরাধ প্রমাণ হয়ে গেলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আর আদালতপাড়ায় এমন গল্পের আসা-যাওয়া বহু পুরোনো। এমনই একটি গল্প এসেছে আমার সংবাদ প্রতিবেদকের নজরে। আইনের ধারা না বুঝলেও আসামির জন্য শেষ দৌড় পর্যন্ত দৌড়াচ্ছেন একটি পরিবারের সদস্যরা ।
তারা বলছেন, ‘আমরা কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করব তো দূরে থাক মোবাইল চালাতেই জানি না। আজকে (আসামিকে) কোর্টে উঠাবে শুনে মায়া লাগে এ জন্য রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার কানাপাড়া গ্রাম থেকে দেখতে এসেছি। দৌড়ানোর মতো সক্ষম একমাত্র ছেলে ফাহিম আছে তারও আবার মাথায় সমস্যা। প্রায় সময়ই থাকেন পাগল অবস্থায়। ওষুধ না খেলে সবার সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করে, এমনকি মারধরও করে। এজন্য তার ওপর মামলা চালানোর সম্পূর্ণ ভরসা করতে পারছে না হিরোইন মামলায় কারাবন্দি গোলাপ নবির পরিবারটি’। বর্তমানে তার তিন সন্তান যার মধ্যে (ফাহিম) বড় এবং অন্য দুই সন্তান হোজাইফা (৯) ও বাসরী (৪)। তিন বছর চার মাস ধরে জেলে আছেন গোলাপ।
আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, হয়তো জামিনও হবে না আর আসামি গোলাপ নবির। এরপরও জামিনের জন্য ছোটাছুটি করছে তার আইন অসচেতন পরিবার। মনেই হচ্ছে যতটুকু বুঝেন ততটুকু নিয়েই তাদের জামিনের আশা। গত রোববার মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনের দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জজকোর্ট হাজতখানার দিকে তাকিয়ে এসব বলছিলেন আসামির স্ত্রী ও তার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ বোন। একনজর কারারুদ্ধ স্বামীকে তার স্ত্রী, ভাইকে বোন ও পিতাকে সন্তানরা দেখার জন্য অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। চোখেমুখে সাদাসিধে আইন-আদালত না বোঝার ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের দিকে তাকালে। জানা যায়, স্বাভাবিক জীবনে টমেটো নিয়ে আড়তে নিয়ে ব্যবসা করতেন গোলাপ নবি । হিরোইনসহ ধরা পড়ে কিভাবে জানতে চাইলে তার স্ত্রী গোলাপী ও বোন ফজিলা জানান, তার বন্ধু বাবলু ওরফে (ফিরিং) নাকি তাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে।
এ মামলা সম্পর্কে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রশিদ আমার সংবাদ প্রতিবেদককে বলেন, আসামি ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ৩৩৫ গ্রাম হিরোইন নিয়ে গ্রেপ্তার হয়। এরপর তার পক্ষে মহিদুল ইসলাম নামে অন্য আইনজীবী ছিল। তিনি দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনা করেন। পরিচালনা পরবর্তী সময়ে এ মামলায় পাঁচজন সাক্ষী হয়েছে। এর মধ্যে একজন বাদী সাক্ষী এবং চারজন সঙ্গীয় ফোর্স এবং কোনো সাক্ষীকেই জেরা করা হয় নাই এবং পরবর্তীতে ওই আইনজীবী মহিদুল ইসলাম (এনওসি) অনাপত্তি পত্র দেয়। এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে এ মামলা পরিচালনার দায়িত্ব আমি নেই। নেয়ার পর সর্বশেষ আমি গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ শুনানি করি। শুনানি করে বিজ্ঞ আদালতে সাক্ষীদের জন্য পুনরায় ডাকার আবেদন করি। যেহেতু তাদের জেরা করা হয়নি এবং বিজ্ঞ আদালত এ আবেদন মঞ্জুর করেন। জামিনের আবেদন পরবর্তী আদেশের জন্য রাখেন। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি আসামির জামিন আদালত না মঞ্জুর করেন।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেন, মামলাটি সাক্ষীর জন্য আছে। তবে সাক্ষী যেহেতু পাঁচজন হয়ে গেছে, সেহেতু আর মনে হয় কোনো কিছু করার সুযোগ নাই। এখানে (অধস্তন) আদালতে জামিন দিবেন না এবং সর্বোচ্চ রায় দেবেন।
উল্লেখ্য, মাদকদ্রব্য সম্পর্কে ধারা ৯ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (খ) এর লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ সাজা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন। সেখানে উল্লেখ আছে যে, মাদকদ্রব্যের পরিমাণ যদি ২৫ গ্রাম অথবা মিলিমিটারের বেশি হয় তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হবে। এবং সেখানে আসামিকে ৩৩৫ গ্রাম হিরোইন নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ জন্যই তার এতদিন হলেও জামিন হচ্ছে না। স্বজনকে দেখার জন্য এমন আরও অপেক্ষায় আছেন রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন সিপাহীবাগ থেকে আসা আসামি অটোচালক জালালুদ্দীনের স্ত্রী শাবানা। র্যাবের সোর্সদের মারধরের জন্য নাকি তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী।
তিনি জানান, র্যাবের সোর্সদের নিয়মিত চাঁদা দিত আসামি শাহজালাল। টাকা দেয়ার পরও তাকে ধরিয়ে দিয়েছেন তারা। পরবর্তীতে সে মামলা থেকে বের হয়ে সোর্সদের মারধর করে। এরই জের ধরে সকালে হোটেলে নাস্তা খেতে গেলে শাহজালালকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন এ আসামির স্ত্রী। গত দুই মাস ধরে (২০২৩ এর ডিসেম্বর মাসের ১৯) জেলহাজতে আছেন তিনি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে তার স্বামী আগে নেশা-পানির সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু এখন সে ভালো হয়ে গেছে।
তবে আসামির স্ত্রী সূত্রে আরও জানা যায়, এ মামলাটি নাকি ২০১২ সালের। হাজিরা দেয়ার পর ২০১৬ সালে এর সাজার আদেশ দেয় আদালত। গত দুই মাস আগে গ্রেপ্তার হওয়ার কারণ জানতে চাইলে শাবানা আমার সংবাদ প্রতিবেদককে বলেন, আসলে এ মামলা সম্পর্কে বেখবর ছিল তারা। কারণ অন্য দু-তিনজন মামলার পার্টনার ছিল তারা খালাস পেয়ে গেছে। এজন্য তারাও মনে করেছিল সেও খালাস পেয়ে গেছে। মূলত সমস্যাটা এখানেই হয়েছে বলে জানান শাহজালালের স্ত্রী।
সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে শাবানা বলেন, এখন হাইকোর্টে আপিল করতে হবে। তার স্বামীর মামলাটি কোন অ্যাডভোকেটের অধীনে রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা শুধু মুহুরিকে চিনি তার নাম (মাসুদ) কিন্তু অ্যাডভোকেটকে চিনি না।
আদালতপাড়ায় এমন আইন না জানা অসচেতন মানুষের এখনো অভাব নেই। হয়তো আসামিদের মধ্যেও এমন অপরাধ প্রবণতার কারণ আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা— বলছেন অনেক বিজ্ঞ আইনজীবী।