নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৫, ২০২৬, ১২:০১ এএম
ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি জনমনে স্বস্তি ফেরাতে এক মহাপরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ, চাঁদাবাজি এবং যানজটের গোলকধাঁধা থেকে রাজধানী মুক্ত করতে এবার সরাসরি অ্যাকশনে যাচ্ছে প্রশাসন। গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর পরিদর্শনকালে তিনি যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের এক নতুন ইশতেহার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১. চাঁদাবাজির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার
ঢাকার প্রতিটি সেক্টরে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের এক সামাজিক ব্যাধি। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে ফুটপাত কিংবা নির্মাণাধীন ভবন সবখানেই অদৃশ্য হাতের ইশারা কাজ করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে আর মৌখিক হুঙ্কার নয়, বরং সুনির্দিষ্ট তালিকার ভিত্তিতে চালানো হবে সাঁড়াশি অভিযান।
পেশাদারিত্বের প্রতিফলন: মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা করা হবে। এতে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কোনো ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারবে না।
বিশেষ অভিযান: তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পরপরই ডিএমপির বিশেষ দলগুলো মাঠে নামবে। এর লক্ষ্য কেবল চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার নয়, বরং চাঁদাবাজির উৎসগুলো চিরতরে বন্ধ করা।
২. পুলিশি সংস্কার: তাবেদারি থেকে জনবান্ধব হওয়ার পথে
বিগত বছরগুলোতে পুলিশ বাহিনীর ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা দূর করা বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, পুলিশের ‘তাবেদারি কালচার’ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের দিন শেষ।চেইন অব কমান্ড ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা
প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলার অভাব একটি বড় ক্ষত। মন্ত্রী একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করে বলেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড বা আদেশের স্তরগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
‘কোনো থানার ওসি সরাসরি মন্ত্রীকে ফোন করতে পারবেন না। এটি শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। প্রত্যেককে তার ওপরস্থ কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে।
এটি মূলত প্রশাসনের ভেতরে পেশাদারিত্ব ফেরানোর এবং প্রভাবশালীদের অবৈধ তদবির বন্ধ করার একটি সুচিন্তিত কৌশল।
৩. যানজট নিরসন ও ব্যাটারিচালিত রিকশার চ্যালেঞ্জ
ঢাকা শহরের প্রাণভোমরা হচ্ছে এর গতি। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ট্রাফিক অব্যবস্থাপনায় শহরটি স্থবির হয়ে পড়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সংকটের সমাধানে ডিএমপিকে নতুন করে ভাবার নির্দেশ দিয়েছেন।
কার্যকর পদক্ষেপ: ব্যাটারিচালিত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে কোনো আবেগ নয়, বরং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজছে সরকার।
ডিএমপিকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট: যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি সড়ক বিভাজন এবং রিকশার রুট নির্ধারণ নিয়ে ডিএমপিকে আলাদা করে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. ‘ব্যক্তি নয়, আইনই শেষ কথা’
সালাহউদ্দিন আহমদ জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসন কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলবে না। তিনি বলেন, “ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো পুলিশিং চলবে না; পুলিশ আইনের গতিতেই চলবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত ‘ফ্যাসিবাদী রেজিমের’ আমল থেকে বর্তমান প্রশাসনের পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, ‘আগের সরকারের সঙ্গে তুলনা না করে বর্তমান প্রশাসনের কার্যক্রম দিয়ে আমাদের মূল্যায়ন করুন।’ এটি মূলত জনমনে আস্থা ফেরানোর একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
৫. পোশাক বনাম মানসিকতা: সংস্কারের গভীর দর্শন
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ছিল। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে এক গভীর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পোশাক পরিবর্তন একটি বাহ্যিক বিষয়, আসল সংস্কার হওয়া প্রয়োজন মানসিকতায়।
‘শুধু পোশাক বদলালে মানসিকতার পরিবর্তন হয় না; তাই এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
এর অর্থ হলো, সরকার বাহ্যিক চাকচিক্য বা নাম বদলানোর চেয়ে পুলিশের সেবার মান এবং জনগণের প্রতি তাদের আচরণের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
৬. আলোচিত মামলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সফরকালে মন্ত্রী হাদি হত্যাকা্লের তদন্ত নিয়েও কথা বলেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, তদন্ত কাজ স্বচ্ছতার সাথে চলছে এবং অপরাধী যেই হোক, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। একইসাথে দাগি আসামি এবং অবৈধ অস্ত্রধারীদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি।
এক নজরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মূল ৫টি হাইলাইট:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ডিএমপি সদর দপ্তর পরিদর্শনের এই ঘটনাটি কেবল একটি দাপ্তরিক সফর নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের একটি রোডম্যাপ। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এটি জনগণের সরকার। পুলিশ যখন জনগণের বন্ধু হতে পারবে এবং রাজধানীর রাস্তা যখন চাঁদাবাজমুক্ত হবে, তখনই এই পদক্ষেপগুলো পূর্ণ সার্থকতা পাবে।
ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য এই ঘোষণাগুলো একাধারে আশার আলো এবং প্রশাসনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখন দেখার বিষয়, তালিকার ভিত্তিতে অভিযান এবং শৃঙ্খলার এই নতুন বার্তা মাঠ পর্যায়ে কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।