ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

অর্থঋণ আদালতে মামলার পাহাড়

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মার্চ ১১, ২০২৬, ১২:০৯ এএম

অর্থঋণ আদালতে মামলার পাহাড়

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ খেলাপির সংখ্যা ও মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে। অর্থঋণ আদালতে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা এখন আড়াই লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু এসব মামলার বড় অংশই বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। কারণ, অনেক ঋণ খেলাপি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করিয়ে দিচ্ছেন। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাওনা অর্থ আদায়ে মারাত্মক জটিলতার মুখে পড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। এতে করে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

মামলার সংখ্যা বেড়ে আড়াই লাখের কাছাকাছি

সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে মোট মামলা এখন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ৫৮২টি মামলা। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংখ্যাটি শুধু আইনি মামলার পরিসংখ্যান। এর বাইরে আরও অনেক ঋণখেলাপি রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে মামলা এখনো করা হয়নি বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মামলা যত বাড়ছে, ততই ব্যাংকগুলোর অর্থ আটকে যাচ্ছে এবং ঋণ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে উঠছে।

আইনি জটিলতায় বিপুল অর্থ

ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ঋণখেলাপিদের মামলায় প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং নতুন ঋণ বিতরণেও প্রভাব পড়ছে। অনেক ব্যাংক কর্মকর্তার মতে, বড় অঙ্কের ঋণগুলোই মূলত আদায় করা সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘রিটের ফাঁদে’ মামলার গতি থেমে যায়

অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের হওয়ার পর অনেক ঋণ খেলাপি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। এর মাধ্যমে তারা মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার চেষ্টা করেন। উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়া গেলে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেক খেলাপি বছরের পর বছর সময় পার করে দেন। ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, অনেক সময় মামলার নিষ্পত্তি হতে ৫ থেকে ১০ বছরপর্যন্ত সময় লেগে যায়।

ব্যাংকগুলোর দাবি : রিটের আগে টাকা জমা বাধ্যতামূলক করা হোক

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, যদি রিট আবেদন করার আগে ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ জমা দেয়ার বিধান চালু করা হয়, তাহলে অনেক খেলাপি দ্রুত সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে। জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ছোট অঙ্কের ঋণ আদায় করা সম্ভব হলেও বড় অঙ্কের ঋণ ফেরত পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছোট ছোট ঋণ আমরা তুলনামূলকভাবে আদায় করতে পারি। কিন্তু বড় বড় ঋণগুলো ফিরিয়ে আনা যায় না। যদি রিট করার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে অনেক খেলাপি সমঝোতায় আসবে।’ তার মতে, রাষ্ট্র যদি এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর বার্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মামলাগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী এগিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ‘মামলা করা মানেই দায়িত্ব শেষ নয়। ব্যাংকগুলোকে মামলাগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ভালো আইনজীবী নিয়োগ করা, শুনানির তারিখ দ্রুত এগিয়ে আনা এবং মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা

আইনজীবীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসাইন বলেন, অনেক সময় ঋণগ্রহীতারা যে ঠিকানায় ঋণ নেন, পরে সেই ঠিকানায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তাদের নোটিশ দেয়া এবং আদালতে হাজির করানো অনেক সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘অনেক ঋণ খেলাপি মনে করেন মামলা হলে অন্তত পাঁচ বছর সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে তারা বিভিন্ন আইনি কৌশল ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণ করেন।’ তার মতে, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।

অর্থঋণ আদালতের সীমাবদ্ধতা

অর্থঋণ আদালত মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত বিশেষ আদালত। কিন্তু মামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আদালতগুলোতে কাজের চাপও বেড়ে গেছে। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, অনেক আদালতে বিচারকের সংখ্যা কম এবং মামলার পরিমাণ বেশি হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয় না।

ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ খেলাপির সমস্যা শুধু ব্যাংকের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। যখন ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ আদায় করতে পারে না, তখন তাদের আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে নতুন বিনিয়োগে ঋণ দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কঠোর আইনের দাবি

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, দ্রুত বিচার, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে অনেক মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধানের কথা উল্লেখ করেছেন-  রিট আবেদন করার আগে ঋণের একটি অংশ জমা দেয়ার বিধান চালু করা, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, মামলার নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা, ব্যাংকগুলোর আইনি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ঋণ খেলাপির সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রতি বছর নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে আটকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়বে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা তাই দ্রুত আইনি সংস্কার এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

Link copied!