মো. নেয়ামত উল্যাহ
মার্চ ২৬, ২০২৬, ০১:২৭ এএম
দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। বহু প্রতীক্ষিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট আগামী জুলাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে। এর আগে আগামী ৭ এপ্রিল কেন্দ্রটির পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড করার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে বছরের শেষ নাগাদ পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো হবে।
ইউরেনিয়াম লোডিং, উৎপাদনের পথে বড় ধাপ : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ইউরেনিয়াম লোডিং প্রক্রিয়া শুরু হবে ৭ এপ্রিল। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ইউরেনিয়াম লোডিং সম্পন্ন করতে প্রায় ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে চুল্লির বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
জুলাইয়ে উৎপাদন, ডিসেম্বর নাগাদ পূর্ণ সক্ষমতা : সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম লোডিং ও অন্যান্য প্রস্তুতি শেষে জুলাই মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ নাগাদ পুরো ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট হওয়ায় প্রথম ইউনিট থেকেই উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
কীভাবে কাজ করে পারমাণবিক চুল্লি : রূপপুর প্রকল্পের মূল কাঠামো হলো পারমাণবিক চুল্লি বা রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল। এখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫। এই প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয় ইউরেনিয়াম খনি থেকে সংগ্রহ করে ছোট পেলেট আকারে প্রস্তুত করা হয়, এই পেলেটগুলো ধাতব টিউবের মধ্যে ভরে তৈরি করা হয় ফুয়েল রড, একাধিক ফুয়েল রড একত্রিত করে তৈরি হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি, প্রতিটি অ্যাসেম্বলি প্রায় ৩.৫ থেকে ৪.৫ মিটার লম্বা। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে।
জ্বালানি লোড করার পর নিউট্রন হিট প্রয়োগের মাধ্যমে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রিতভাবে চেইন রিঅ্যাকশনে রূপ নেয় এবং তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপ থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘোরায়, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে এবং প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
রাশিয়ার সহযোগিতা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৩ সালে প্রাথমিক সমীক্ষা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সমান। এই প্রকল্পে ব্যবহূত ইউরেনিয়াম জ্বালানিও রাশিয়া সরবরাহ করছে এবং ভবিষ্যতেও তারা জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে শুরু করে বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশে চলমান সংকটের সমাধানে একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর এবং ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উভয় নেতাই অনুভব করেছেন। উম্মাহর মধ্যকার বিভেদ দূর করে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেন।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা ও শান্তির প্রচেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে পাকিস্তানের সামপ্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন। বিশেষ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন, সংঘাত নিরসন এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে, তা তিনি তুলে ধরেন।
পাকিস্তান সবসময়ই যুদ্ধের চেয়ে আলোচনার টেবিলকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। শাহবাজ শরীফ স্পষ্ট করেন যে, পাকিস্তান চায় না কোনো পক্ষই চরমপন্থার দিকে ধাবিত হোক, বরং ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
সৌদি আরবের প্রশংসা ও সমর্থন : পাকিস্তানের এই শান্তির প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি পাকিস্তানের গঠনমূলক এবং ইতিবাচক কূটনৈতিক ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেন।
সৌদি আরব বিশ্বাস করে যে, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য পাকিস্তানের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের শান্তিপ্রিয় অবস্থান অত্যন্ত জরুরি। ক্রাউন প্রিন্স এই মর্মে আশ্বস্ত করেন যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও সৌদি আরব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ : পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছ অর্থনৈতিক সহযোগিতা: সৌদি আরব পাকিস্তানের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী দেশ। বিশেষ করে খনিজ সম্পদ, জ্বালানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড পাকিস্তানে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্ক: দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বিদ্যমান।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় দেশ নিয়মিত যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স: সৌদি আরবে লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানি প্রবাসী কর্মরত আছেন, যারা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বিশাল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। শাহবাজ শরীফ এই প্রবাসীদের কল্যাণে সৌদি সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এই কথোপকথন প্রমাণ করে যে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও পাকিস্তান ও সৌদি আরব একে অপরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। উভয় নেতাই সব পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই সংলাপে যে শান্তির বার্তা এবং ঐক্যের ডাক দেয়া হয়েছে, তা কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করবে।