ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সংখ্যায় কমলেও থামেনি ‘মব’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ২০, ২০২৬, ১২:৪০ এএম

সংখ্যায় কমলেও থামেনি ‘মব’

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সমাজব্যবস্থায় এক মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে জেঁকে বসেছে ‘মব কালচার’ বা দলবদ্ধ জনতা কর্তৃক আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন সরকার গঠনের পর নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে তার প্রথম কর্মদিবসেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই দেশে আর মব কালচার থাকবে না, এটি ভুলে যান।’

সরকারের এই শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি এবং নানামুখী প্রতিশ্রুতির পরও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির মতো জঘন্য অপরাধ পুরোপুরি থামানো যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুলনায় বর্তমানে মব সহিংসতার সামগ্রিক সংখ্যা কিছুটা কমলেও মে মাসের মাঝামাঝি এসেও এই বর্বরতা অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি, চুরির অপবাদ কিংবা ভিন্নমতের অজুহাতে দিনদুপুরে পরিকল্পিতভাবে দলবদ্ধ হামলার ঘটনা এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত ঘটছে, যা নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে।

গত ১১ এপ্রিল দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ‘মব’ সহিংসতার ভয়াবহ রূপকে আবারও সামনে এনেছে। সেখানে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের একজন স্থানীয় পীরকে টার্গেট করা হয়। উত্তেজিত একদল জনতা পরিকল্পিতভাবে দিনদুপুরে তাকে অবরুদ্ধ করে এবং একপর্যায়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বর্বরতা কেবল হত্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; হামলাকারীরা তার আস্তানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে চারপাশ পুড়িয়ে দেয়।

তদন্তকারী সংস্থা এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সময়ে মব বা গণপিটুনি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এর সিংহভাগই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা আদর্শিক দ্বন্দ্বে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঘায়েল করতে মব-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হামলার মূল হোতারা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (যেমন ফেসবুক) কিংবা স্থানীয় ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাইক ব্যবহার করে উসকানিমূলক মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে দেয়। এরপর সাধারণ আবেগপ্রবণ মানুষকে উত্তেজিত করে মাঠে নামানো হয়। দিনশেষে যখন হত্যাকাণ্ড বা ভাঙচুর সম্পন্ন হয়, তখন মূল পরিকল্পনাকারীরা ‘তৌহিদি জনতা’ কিংবা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যানারের আড়ালে নিজেদের চেহারা লুকিয়ে ফেলে। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধীদের চিহ্নিত করা ও আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র যে ভিন্ন, তা প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মাসিক প্রতিবেদনে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) গত ৩০ এপ্রিল দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গেছে মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে মব সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি: এমএসএফের তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে মব বা গণপিটুনিতে দেশজুড়ে মোট ২১ জন নিহত হয়েছেন, যা মার্চ মাসে ছিল ১৯।

ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি: এপ্রিল মাসে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ৪৯টি, যেখানে মার্চ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩৬টি। আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি: এপ্রিলে মব বা গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছেন ৪৯ জন, যা আগের মাসে ছিল ৩১।

এমএসএফের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট মো. সাইদুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলার যে চরম বিপর্যয় ঘটেছিল, সেই তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলে মব সহিংসতা কিছুটা কমেছে সত্য, তবে তা কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সভ্য সমাজে একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা মব সহিংসতায় প্রাণহানি কাম্য হতে পারে না। সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।’ দেশের প্রধান প্রধান মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেয়া তথ্য একত্র করলে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার-পাঁচ মাসের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ দেখায়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে মব বা গণপিটুনিতে দেশের বিভিন্ন বিভাগে মোট ৬১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আসক-এর সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির এক সম্পূরক তথ্যে জানিয়েছেন, চলতি মে মাসের প্রথম ১৯ দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত ৬ জন মব সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য: এইচআরএসএস-এর পরিসংখ্যানও প্রায় একই ধরনের ভয়াবহতার সাক্ষ্য দেয়। তাদের তথ্যমতে, গত এপ্রিল মাসে ৪৪টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২২ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। আর বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ৮৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন গুরুতর আহত হন।

সর্বোপরি, গণপিটুনি বা মব জাস্টিস মূলত একটি রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের অনাস্থা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু কোনো স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্মত্ত জনতাকে ‘বিচারক’ ও ‘জল্লাদ’-এর ভূমিকা পালন করতে দেয়া যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ‘মব কালচার থাকবে না’ এই রাজনৈতিক বক্তব্য তখনই সার্থক হবে, যখন কুষ্টিয়া বা ঢাকার বুকে ঘটে যাওয়া প্রতিটি মব হত্যাকাণ্ডের মূল উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া সম্ভব হবে।

Link copied!