নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১১, ২০২৬, ১২:৫৮ এএম
ঢাকার আকাশজুড়ে অঝোর ধারায় ঝরছে শ্রাবণের বৃষ্টি। মেঘলা আকাশ আর অবিরাম বর্ষণ রাজধানী ঢাকাকে এক ভিন্ন আবহে নিমজ্জিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পকেট উভয়ের ওপরই এর প্রভাব পড়েছে নেতিবাচক। বিশেষ করে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে বৃষ্টির পানি জমেছে কি জমেনি, তার আগেই যেন পণ্যের দামে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান বাজারগুলোতে সবজির সরবরাহ নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, আর এই সুযোগটিই লুফে নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া, তালতলা, কারওয়ান বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচাবাজারগুলোতে গতকাল শুক্রবার সকালে ক্রেতারা গিয়ে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। বৃষ্টির অজুহাত তুলে বিক্রেতারা বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রায় প্রতিটি সবজির দাম। কোথাও কোথাও কেজিতে ১০ টাকা, আবার কোথাও ৪০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকা হচ্ছে। করলা, পটল, ঢ্যাঁড়স, বেগুন সবকিছুর দামই যেন নাগালের বাইরে। কাঁচামরিচের ঝাল রীতিমতো সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে পানি বের করার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। টমেটো ও শাকসবজির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষেরা দিশাহারা। তারা যখন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, বিক্রেতাদের মুখে একটাই বুলি ‘বৃষ্টির কারণে ট্রাক আসছে না’, ‘ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে’ অথবা ‘সরবরাহ কম’। অথচ বাজার ঘুরে বাস্তব চিত্রের সাথে এই দাবির খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, সবজিতে ভরপুর ডালিগুলো ক্রেতাদের অপেক্ষায় আছে। ঘাটতি যেখানে সামান্য, সেখানে দাম বাড়ানোর এই প্রবণতা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। ক্রেতাদের ক্ষোভ ও হতাশা যখন বাড়ছে, তখন বিক্রেতারা নিজেদের দায়ভার আবহাওয়ার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নির্বিকার। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই বৃষ্টির দিনে বাজারদর যেন এক বাড়তি বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি বা দুটি বাজারের চিত্র নয়, বরং পুরো রাজধানীর বাজারব্যবস্থার এক চিরচেনা সংকট। যখনই প্রকৃতি কোনো প্রতিকূলতার ইঙ্গিত দেয়, তখনই এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সক্রিয় হয়ে ওঠেন অতিরিক্ত মুনাফার লোভে। নেই পর্যাপ্ত বাজার মনিটরিং, নেই কঠোর কোনো জবাবদিহিতা। ফলে বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাট ডুবছে, আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে বাজারের উত্তাপে। বৃষ্টির এই মৌসুমে সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাজারকে রক্ষা করতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যথায়, আকাশের মেঘের মতোই নিত্যপণ্যের দামের পারদ যে কোনো সময় আরও উঁচুতে চড়তে পারে, যার ভার বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
বাজারের বর্তমান চিত্র: করলা ৬০-৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৫০-৬০, পটল ৬০-৮০, বেগুন ৮০-১২০, সজনে ১৬০-২০০, কাঁচামরিচ ১৪০-১৬০, টমেটো ১৮০-২২০ টাকা। শাকের বাজারেও একই চিত্র। লাল শাক ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা এবং পুঁই শাক ৪০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া আলু ২৫-৩০ এবং দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। সবজির বাজারে অস্বস্তি থাকলেও মাছ ও মাংসের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। গত সপ্তাহের দামেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জাতের মুরগি। ব্রয়লার ১৬৫ টাকা কেজি, সোনালি কক ৩৩০, লেয়ার ৩৪০, দেশি মুরগি ৭০০ টাকা কেজি। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে এবং খাসির মাংসের দাম ১,৩০০ টাকা। মাছের বাজারেও রুই, কাতল থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছে ভিন্ন ভিন্ন দাম দেখা গেছে। তবে ইলিশ মাছের দাম এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে (১২০০-২০০০ টাকা কেজি)। বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ে বিক্রেতাদের দাবি, টানা বৃষ্টিতে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় রাজধানীমুখী সবজির ট্রাক কম আসছে, ফলে সরবরাহ কমে গেছে।
অন্যদিকে, শেওড়াপাড়া বাজারের নিয়মিত ক্রেতা জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আকাশে মেঘ দেখলেই অসাধু ব্যবসায়ীরা বৃষ্টির দোহাই দিয়ে কারসাজি করে। বাজারে এসে দেখি সব দোকান মালে ভরপুর, কোনো ঘাটতি নেই; অথচ দাম বাড়তি। এটি শুধুই পকেট কাটার কৌশল।’
সর্বোপরি, রাজধানীর কাঁচাবাজারে বৃষ্টির অজুহাতে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি এখন একটি চেনা চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাবে ব্যবসায়ীরা আবহাওয়ার দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। সবজির সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও দাম যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। জনদুর্ভোগ কমাতে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারি তদারকি সংস্থাগুলোকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।