মো. নেয়ামত উল্যাহ
জুলাই ৯, ২০২৬, ১২:৩৬ এএম
প্রকৃতির বৈরী আচরণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত। গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ছন্দে তৈরি করেছে চরম স্থবিরতা। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির এই অবিরাম ধারা যেন জনদুর্ভোগের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে।
একদিকে আকাশছেঁড়া বৃষ্টি, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভঙ্গুর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরের অলিগলি পরিণত হয়েছে ছোটখাটো জলাশয়ে। পথচারী থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ- সবাই প্রকৃতির এই দুর্যোগের সামনে অসহায়। রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, মিরপুর ও ধানমন্ডিসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে হাঁটু সমান পানি জমে থাকায় যানচলাচলে প্রচুর বিঘ্ন ঘটতে দেখা গেছে।
গণপরিবহন সংকটে বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়, কর্মস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থতা এবং পথচারীদের চরম ভোগান্তি এক অসহনীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু পরিবহন চালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিযোগিতায় মেতেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। নিচু এলাকার অসংখ্য ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের অন্যান্য প্রান্তেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি নেই। চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাহাড় ধসের সতর্কবার্তা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগামী কয়েকদিনও এই বৃষ্টিপাত ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আকাশ থেকে ঝরানো জল বৃষ্টির আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে তা এখন নগরবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, খাল ভরাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে দেয়ার ফলেই সামান্য বৃষ্টিতেই এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এলেও আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় তার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো আধুনিকায়ন দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির এই দিনে রাজধানীর রাজপথে প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে ফুটে উঠছে উৎকণ্ঠা আর দ্রুত ঘরে ফেরার আকুলতা। এই চরম ভোগান্তি নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, অনাগত দিনে এমন দুর্যোগ ও দুর্ভোগের মাত্রা যে আরও বাড়বে- তা বলাই বাহুল্য। এখন শুধু আকাশ পরিষ্কার হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে সারা দেশের ভুক্তভোগী মানুষ।
গতকাল সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সকালের দিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হলেও দুপুরের পর থেকে তা রূপ নেয় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে। এর ফলে রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মিরপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় পানি জমে যায়। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধীরগতির হওয়ায় পথচারীদের হাঁটু সমান জল মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। যারা ব্যক্তিগত গাড়িতে বা বাসে ছিলেন, তারাও পড়েছেন ভয়াবহ যানজটের কবলে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে দেখা গেছে যানবাহনকে। অনেক ক্ষেত্রে পানি জমে রাস্তায় গাড়ি বিকল হওয়ার ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ‘সকাল ১০টায় মতিঝিলে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি, কিন্তু ফার্মগেট পৌঁছাতেই দুই ঘণ্টা লেগেছে। বাস নেই, রিকশায় যে যাব, তাদের ভাড়াও আকাশছোঁয়া।’ অফিস ফেরত যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম ছিল। যেসব বাস ছিল, তাতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। বাস স্টপেজগুলোতে শত শত মানুষকে ভিজে কাকভেজা হয়ে দীর্ঘক্ষণ বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন দোকানের ছাউনি বা ভবনের নিচে। ভিড়ের সুযোগে অনেক অসাধু চালক ও রিকশাচালক স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া হাঁকিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর ফার্মগেট, মিরপুর, মতিঝিল এবং ধানমন্ডি এলাকার নিচু জায়গাগুলোতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং নিয়মিত সংস্কারের অভাবকে জলাবদ্ধতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
টানা বৃষ্টিতে চার বিভাগে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে এসব অঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত তিন দিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী শনিবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। একই সময়ে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদ-নদীর পানি কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব জেলার নদীসংলগ্ন নিচু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এ ছাড়া সুরমা-কুশিয়ারা, গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব নদীর অববাহিকার নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি প্রায় তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে শনিবার থেকে বৃষ্টিপাত কমে এলে নদ-নদীর পানির স্তর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন, আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসরণ এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচল না করার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়ার এই প্রতিকূল অবস্থায় কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
এছাড়া, পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, রাজধানীর জলনিষ্কাশন পথগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত সরানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ আর রাজধানীর দুর্বল অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে নগরবাসীর ভোগান্তি বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৃষ্টি প্রকৃতির আশীর্বাদ হলেও ঢাকাসহ উপকূলীয় শহরগুলোর জন্য বিশেষভাবে চট্টগ্রাম ও বরিশাল এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং ভবিষ্যতের বড় কোনো দুর্যোগ এড়াতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন দুর্যোগের এই শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তাই সচেতনতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।