নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১২, ২০২৬, ০১:১৬ এএম
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, তা আজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ জরিপ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)’ অনুযায়ী, দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে। সহজ ভাষায়, প্রতি ১০ জন মা আগে যে ২৩টি সন্তানের জন্ম দিতেন, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সামান্য বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য মনে হলেও এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনিসংকেত।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা টিএফআর বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত জনবলসংকট এখন প্রকট। অধিদপ্তরের মোট ৫৪ হাজার ২২৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে ২৭ শতাংশ বা প্রায় ১৪ হাজার ৫৫০টি পদই শূন্য। অনেক জেলায় এই শূন্যতার হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর তীব্র সরবরাহ সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারিভাবে বড়ি, কনডম, ইনজেকটেবলসহ অন্যান্য সামগ্রীর সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রায় ১০ শতাংশ দম্পতি চাহিদামাফিক জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী পাচ্ছেন না। ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং জন্মহার বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষকরা বলছেন, টিএফআর বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সুদূরপ্রসারী— জনসংখ্যার চাপ: দেশে প্রজনন বয়সের (১৫-৪৯ বছর) মায়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। গড় সন্তানসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে জনসংখ্যার বাড়তি চাপ পড়বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতের ওপর। প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৬৩ লাখে পৌঁছাতে পারে। স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: ঘন ঘন গর্ভধারণ ও প্রসবের ফলে মায়েদের রক্তস্বল্পতা, পুষ্টিহীনতা, জরায়ু নেমে যাওয়া ও ফিস্টুলাসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি নবজাতকের অপুষ্টি ও কম ওজন নিয়ে জন্মের আশঙ্কাও প্রবল হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন: সন্তান লালন-পালনের বাড়তি দায় নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিল। ১৯৭৫ সালে টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৩, যা পরিকল্পিত কর্মসূচি ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০১১ সালে ২ দশমিক ৩-এ নামিয়ে আনা হয়। দীর্ঘ সময় এই হার স্থিতিশীল থাকলেও তা ২ দশমিক ১-এ (প্রতিস্থাপনযোগ্য হার) নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বিগত সরকারগুলোর আমলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য বিভাগকে একীভূত করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক বক্তৃতায় জনসংখ্যাকে ‘বোঝা’র পরিবর্তে ‘শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতা জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৌশলগত দিক থেকেও ‘দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগান নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিবর্তন কর্মীবাহিনীর মনোবল ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছেন বানভাসি মানুষ।
কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকা বন্যার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ১২ জুলাই পর্যন্ত অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। বান্দরবানের সকল পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সাজেক ভ্যালি থেকে ৪৬১ জন পর্যটককে সেনাবাহিনী সফলভাবে উদ্ধার করেছে।
বন্যাকবলিতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দুর্গম এলাকায় এখনও সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা পৌঁছায়নি।
চট্টগ্রাম ছাড়াও হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শহররক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে থাকায় স্থানীয়রা আতঙ্কিত। অন্যদিকে, বাগেরহাটের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই বন্যা পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় দুর্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাহাড়ি ঢল এবং অবিরাম বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগে যেভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে, তা মোকাবিলায় ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন এবং পানিবন্দি মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন প্রথম অগ্রাধিকার। আবহাওয়া দপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস বজায় থাকায় আগামী কয়েকদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সরকারের ত্রাণ তৎপরতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বন্যার্ত মানুষের জন্য একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।