নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১২, ২০২৬, ০১:২২ এএম
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাতে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করলেও মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে আসছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ, অন্যদিকে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, আউশ ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ। এতে জেলার হাজারো কৃষক ও মৎস্যচাষি এখন চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মুখে পড়েছেন।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকারও বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে বাঁশখালী উপজেলায়। সেখানে ২ হাজার ৫০০ পুকুর ও ৩১০টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। এরপরই রয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়া, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও পটিয়ার মতো উপজেলাগুলোতেও কোটি কোটি টাকার মৎস্যভাণ্ডার বন্যায় তছনছ হয়ে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, অনেক এলাকায় এখনও পানি পুরোপুরি নামেনি, তাই চূড়ান্ত সমীক্ষা শেষে ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মৎস্য খাতের মতো কৃষি খাতও বন্যায় বড় ধরনের আঘাতের সম্মুখীন হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবমতে, মোট ১৪ হাজার ২৯৬ হেক্টর কৃষিজমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে আউশ ধান ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর। আমনের বীজতলা ৬২১ দশমিক ৬৬ হেক্টর। গ্রীষ্মকালীন বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ডু ও সন্দ্বীপ উপজেলায় আউশ ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে সবজি চাষিরাও দিশেহারা, কারণ চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ডু, সন্দ্বীপ ও সাতকানিয়া অঞ্চলের সবজির ক্ষেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জানিয়েছেন, পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষি বিভাগের কর্মীরা সরেজমিন চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন তৈরি করবেন। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে পুনর্বাসনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।
বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর এখন কৃষকদের প্রধান উদ্বেগ হলো তাদের আবাদি জমি পুনরায় চাষযোগ্য করে তোলা। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং সবজি পচে যাওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছেন। পাশাপাশি মৎস্যচাষিদের পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় তাদের মূলধন হারানোর আর্তনাদ এখন সর্বত্র। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি দপ্তরের পক্ষ থেকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা ঘোষণা করা না হলে এই অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি ও মৎস্য খাতের দুর্বল অবকাঠামোর চিত্রটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলাশয় ও কৃষি জমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে পানি নামার সাথে সাথে যে ক্ষয়ক্ষতির ফিরিস্তি বেরিয়ে আসছে, তা পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। তবে তাৎক্ষণিক পুনর্বাসন কার্যক্রম হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশায় এখন প্রহর গুনছে চট্টগ্রামের বানভাসি মানুষ।