বিশেষ প্রতিনিধি
নভেম্বর ২৫, ২০২৫, ০৫:১৮ পিএম
দেশের সামনে অপেক্ষা করছে এক অনন্য রাজনৈতিক আয়োজন একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট। এ উদ্দেশ্যে প্রণীত গণভোট অধ্যাদেশের খসড়া আজ অনুমোদন দিয়েছে আন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এতে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি চারটি মৌলিক ইস্যু নিয়ে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট, এবং ভোটগ্রহণ হবে রঙিন ব্যালট পেপারে।
মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ এবং প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
গণভোটে ব্যালট পেপার রঙিন রাখার সিদ্ধান্তকে নির্বাচন সংক্রান্ত জটিলতা কমানো ও ব্যালট শনাক্তকরণে সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে স্বাভাবিক রঙে, আর গণভোটের ব্যালট থাকবে আলাদা রঙে—যা ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তি এড়াতে সহায়ক হবে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, দুটি বড় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া একই দিনে আয়োজন করা হবে। তাই জনগণের জন্য ব্যালট শনাক্তকরণ সহজ করতে রঙিন ব্যালট রাখা হচ্ছে।
গণভোটেও থাকবে প্রবাসী ও বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ। এই চার শ্রেণি হলো—১) প্রবাসী কর্মী, ২) সরকারি দায়িত্বে বিদেশে অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৩) নিরাপত্তাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা ভোটার, ৪) শারীরিকভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম বিশেষ নাগরিক।
এতে নিশ্চিত করা হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে কোনো ভোটার বঞ্চিত হবে না।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারেন, তাদের একই সুবিধা গণভোটেও দেওয়া হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানিয়েছিলেন জুলাই জাতীয় সনদ, অর্থাৎ সংবিধান পুনর্গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এর ভিত্তিতেই উপদেষ্টা পরিষদ ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫’ অনুমোদন করে। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এতে স্বাক্ষর করলে সনদটি আইনি ভিত্তি পায়।
এই সনদের বাস্তবায়ন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুটি ঘটনাই একই দিনে আয়োজনের ঘোষণা ছিল সেই আদেশের মূল বিষয়। আজকের সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিল।
আইন উপদেষ্টার ভাষায়, জুলাই জাতীয় সনদ হলো দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি নথি। এর বৈধতা নির্ধারণ করবে জনগণ। তাই নির্বাচন ও গণভোটকে একই দিনে রাখা হয়েছে যাতে জনগণের রায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন অনুযায়ী, ব্যালটে থাকবে একটি মাত্র প্রশ্ন। তবে এই এক প্রশ্ন চারটি মৌলিক বিষয়ের ওপর ভোটারদের সম্মতি বা অসন্মতি জানতে চাইবে। কোন চারটি বিষয় থাকবে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি; শিগগিরই সরকার তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। এই ফরম্যাটের উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের কাছে বিষয়টি সরল রাখা, একইসঙ্গে সংস্কারের মূল চারটি দিককে একবারে অনুমোদন বা বাতিলের সুযোগ দেওয়া।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে সচিব আখতার আহমেদ জানান, দুটি আলাদা ব্যালট, আলাদা গণনা এবং নিরাপদ পরিবহন সব মিলিয়ে বেশি প্রস্তুতি লাগবে। তবে আমরা আগে থেকেই কাজ শুরু করেছি।
রঙিন ব্যালট ব্যবস্থাপনা ও পোস্টাল ব্যালট–সংক্রান্ত নীতিমালা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। ইসির সূত্র মতে, ব্যালট বাক্স দ্বিগুণ হওয়ায় নিরাপত্তা এবং ফলাফল ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে।
জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। সনদে প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো কাঠামোগত প্রস্তাব রয়েছে বলে ধারণা মিলেছে নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াতে পারে। আবার অন্যদের মতে, এতে জনগণের রায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে এবং রাজনৈতিক বৈধতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয় নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি, গণভোট প্রচারণার নিয়ম, ভোটার শিক্ষায় নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন, ব্যালট নকশা ও নিরাপত্তা চিহ্ন সংযোজন।
আইন উপদেষ্টা জানান, গণভোট হলো জনগণের সর্বোচ্চ মতামত জানানোর প্ল্যাটফর্ম। তাই এর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আমাদের প্রথম দায়িত্ব।
সরকার খুব শিগগিরই গণভোট অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করবে। এরপর নির্বাচন কমিশন ব্যালটের নকশা, ভোটগ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার সচেতনতা কার্যক্রমসহ পুরো রূপরেখা ঘোষণা করবে। উপদেষ্টা পরিষদের মতে, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, একইসঙ্গে ভোটার উপস্থিতিও বাড়বে।