সেপ্টেম্বর ৪, ২০২২, ০৯:১৮ পিএম
অপরাধ দমনকারীর প্রশ্রয়েই বাড়ছে বহুবিধ অপরাধ। চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী দর্শনা থানায় ঘটছে এমন ঘটনা। ওই থানার ওসি এ এইচ এম লুৎফুল কবীরের যোগদানের পর থেকেই পাল্টে গেছে থানার দৃশ্যপট। বর্তমান দৃশ্যপট এমন যে বাসিন্দাদের কাছে এখন আতঙ্কের আরেক নাম দর্শনা থানা। যেখানে হত্যার ঘটনায় হয় অপমৃত্যু মামলা, অপমৃত্যু ঘটনায় হয় হত্যা মামলা। ডাকাতির ঘটনায়ও গ্রেপ্তার হন নিরীহরা। নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয় স্বীকারোক্তি। নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও ফাঁসানো হয় ডাকাতি মামলায়। ছাগল চুরির ঘটনায় হয় ডাকাতি মামলা। টাকার বিনিময়ে ওসি নিজেই ধামাচাপা দেন হত্যার ঘটনা। শুধু কি তাই, এ থানার কোনো মামলায় ফাঁসাতে না পারলেও ফাঁসানো হয় পার্শ্ববর্তী জেলার কোনো পেন্ডিং মামলায়।
দর্শনা থানায় এসব ঘটনা অতীতে ঘটেছিল কি-না জানা না গেলেও ওসি লুৎফুল কবীরের যোগদানের পর থেকেই ঘটছে বলে জানা গেছে। তার নির্দেশেই এই থানায় পরিবর্তিত হয় মামলা কিংবা ঘটনার মোটিভ। অসংখ্য ষড়যন্ত্রমূলক মামলার নির্দেশ ও পরামর্শদাতাও এই ওসি।
সর্বশেষ রাস্তায় গাছ ফেলে গণডাকাতির মামলায় নির্যাতনের ঘটনার আগ পর্যন্তও ওসি লুৎফুল কবীরের হিংস্রতায় দর্শনা থানাবিমুখ হলেও ভীতসন্ত্রস্ত মনে বাধ্য হয়েই আইনি সহায়তার আশায় যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর ওসির সব অনিয়মের বাস্তবায়নকারী ওই থানারই সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আহম্মেদ।
এত কিছুর পরও এই ওসি কিংবা এসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নজির নেই। কেউ কেউ বলছেন, ওসি তার মামা পরিচয় দেয়া পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার দাপট দেখিয়েই অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়েও দর্শনা থানায় এসআই আহম্মেদকে নিয়ে গড়ে তোলা দুই সদস্যের সিন্ডিকেটের এত অনিয়ম-অপকর্মের পরও টিকে রয়েছেন বীরদর্পে।
দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো সাধারণত অস্ত্র, মাদক, স্বর্ণ সহ বহুবিধ চোরাচালান এবং এসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুন-খারাবিসহ বহুমাত্রিক অপরাধের আখড়া। এসব অপরাধ দমন তো দূরের কথা উল্টো সীমান্তের চোরাকারবারীদের গডফাদারই বনে গেছেন তিনি। বিষয়টি এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সম্প্রতি নতুন করে জন্ম দিয়েছেন আসামি নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনার।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চুয়াডাঙ্গার আদালতে ক্রিমিনাল রিভিশন মামলাও দায়ের হয়েছে। যার নম্বর-১৩৮/২০২২। এ মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর। যদিও ওসির দাবি, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয়নি। তবে তিনি বলছেন, আসামিরা নিম্ন আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছিল। সেটা নাখোশ করে দিয়েছে আদালত। ডাকাতি মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলাটি ডিবিতে রেফার্ড করা হয়েছে।
সম্প্রতি দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানা এলাকার গয়েশপুর-সড়াবাড়িয়া সড়কের শালিকচারা এলাকায় গাছ ফেলে গণডাকাতির ঘটনা ঘটে। মূলত ওই ঘটনায় গণমাধ্যমের কল্যাণে ওসি লুৎফুুল কবীরের মুখোশ উন্মোচিত হয়।
এর আগে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য-অগণিত অভিযোগ থাকলেও ভয়ে মুখ খোলেনি কেউই। এ সুযোগেই দর্শনা সীমান্তের চিহ্নিত সব অপরাধীর সাথে সখ্য গড়ে ওঠে তার।
দর্শনার বাসিন্দারা বলছেন, মাদক কারবারীদের গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষক ওসি লুৎফুল কবীর। চোরাকারবারীদের আশ্রয়দাতাও তিনি। দর্শনায় গেল দু-তিন মাস আগেও দুটি খুনের ঘটনা ঘটে। টাকার বিনিময়ে দুটি ঘটনাই ধামাচাপা দেন তিনি। গ্রেপ্তার করেন নির্দোষ-নিরীহ ব্যক্তিদের।
আবার হত্যাকাণ্ডকে অপমৃত্যু বলেও চালিয়ে দেন তিনি। তার এমন কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্ত মেলে সিদ্দিক মার্ডারের ঘটনায়। রুদ্রনগরের একটি মাঠে কুড়ুলগাছির জনৈক সিদ্দিককে খুনের পর লাশ ফেলে যায় ডাকাতরা। অথচ সেই হত্যাকাণ্ডকে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখ করে অপমৃত্যু হিসেবে মামলা রেকর্ড করাতে স্বজনদের চাপ সৃষ্টি করেন তিনি।
এছাড়া নতুন গ্রামের আব্দুস সামাদের বিরুদ্ধেও প্রমাণ ছাড়াই ষড়যন্ত্রমূলক মামলার নির্দেশ ও ইন্ধনদাতা খোদ ওসি লুৎফুল কবীর। পুলিশি হয়রানিতে দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতায় থাকার পর হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন নিরপরাধ সামাদ।
সর্বশেষ গয়েশপুর-সড়াবাড়িয়া সড়কে গণডাকাতির ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলার দুই মাস পার হলেও প্রকৃত ডাকাতদের এখনো ধরতেই পারেনি পুলিশ। এখনো উদ্ধারও করতে পারেননি লুট হওয়া ৩৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দর্শনা থানার ওসি লুৎফুল কবীর ওই মামলার ১৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। এরমধ্যে চার আসামিকে তিনি ৪৮ ঘণ্টা থানা হেফাজতে রেখে চরম নির্যাতন করেন। পরে তাদের চুয়াডাঙ্গা আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে ডাকাতির ঘটনার মিথ্যা স্বীকারোক্তি নিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার চেষ্টা করান। আসামিরাও ওসির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন।
পুলিশ কর্তৃক আসামি নির্যাতন মামলার শুনানি আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা ও দায়রা জজ মো. জিয়া হায়দার।
এর আগে গত ৩০ জুন ঝিনাইদহ শহরের মুরারি মোহন সাহার ছেলে ঠিকদার ব্যবসায়ী রনি সাহা তার ব্যবসায়িক পার্টনার ইকরামুল হক ও তাদের প্রাইভেটকারচালক বিশ্বজিৎ কুমার সাহাকে নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগরের শিয়ালমারি এলাকায় আসেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে কাজ শেষে ফেরার পথে দর্শনা থানাধীন গয়েশপুর-সড়াবাড়িয়া সড়কের শালিকচারা এলাকার ফাঁকা মাঠ এলাকায় পৌঁছান।
এসময় ১০-১৫ জন হাফপ্যান্ট পরা একটি ডাকাত দল রাস্তার পাশের একটি বড় গাছ কেটে রাস্তার ওপর ফেলে অস্ত্র ও ধারালো রামদা, হাঁসুয়া তাদের গলায় ধরে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে ১৪ ভরির পাঁচটি স্বর্ণের আংটি, দুটি গলার চেইন, একটি ব্রেসলেট ও নগদ ৫১ হাজার টাকা নিয়ে যায়।
এসময় সড়াবাড়িয়ার জামাল উদ্দিনের ছেলে ঠিকাদার ব্যবসায়ী ওয়াহেদের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা, আলমডাঙ্গার ব্যবসায়ী মৃত এলাহী বক্স মধুর ছেলে কুতুবের কাছ থেকে নগদ ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও স্থানীয় একাধিক পথচারীর কাছ থেকে আরও ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৩৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা, স্বর্ণের গয়না ও টাকা নিয়ে ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী রনি সাহা বাদী হয়ে পরদিন ৩৯৫/৩৯৭ পেনাল কোড-১৮৬০ ধারায় দর্শনা থানায় ১০-১৫ অজ্ঞাত সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের নামে একটি মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হন ওসি লুৎফুল কবীর।
ওই ঘটনায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যায়ক্রমে সন্দেহভাজন ১৩ জনকে আটক করেন তিনি। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় নিশান আলী (২৫), সুজাত আলী (২৫), রিয়াজ হোসেন (২৪) ও নোইম হোসেন বাদী হয়ে সিনিয়র বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আমলি দর্শনা থানা, আদালতে ৭ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে সূত্র জানায়, গত ২ জুলাই সুজাত হোসেনকে আটক করে থানা হেফাজতে রেখে চরমভাবে শারীরিক নির্যাতন শেষে দুদিন পর সুজাত হোসেনসহ বাদীদের ৪ জুলাই চুয়াডাঙ্গা আদালতে পাঠায় পুলিশ। এ অবস্থায় পুলিশ সুজাত হোসেনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ২৩ আগস্ট তার তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিজ্ঞ আদালত। ২৪ আগস্ট রিমান্ড শুরুর পর আবারও নির্যাতনের একপর্যায়ে আসামি সুজাত হোসেন (২৫) গুরুতর আহত হন।
পরে ২৫ আগস্ট দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পুলিশি পাহারায় ভর্তি করে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। মামলাটি সিনিয়র বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত নামঞ্জুর করলে চুয়াডাঙ্গা বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন। বিজ্ঞ দায়রা জজ মো. জিয়া হায়দার মামলাটি গ্রহণ করে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেন।
যদিও জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন আমার সংবাদকে বলেন, ‘এটা কোনো মামলা না। নিম্ন আদালতে একটা অভিযোগ করেছে আসামিরা, বলা হয়েছে আসামিদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আসামি জিজ্ঞাসাবাদের আগেই ভান করে চিৎ হয়ে পড়ছে। বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ছে। এটা আবার নিম্ন আদালত খারিজও করে দিয়েছে। খারিজের পর রিভিশন হয়েছে। রিভিশন হয়ে জেলা জজ মহোদয়ের কাছে গেছে। এটা তো মামলা না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার (ওসি) বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। যতটুকু পেয়েছি আদালতে যেটা হয়েছে, আদালত থেকে যেটা শুনেছি সেটাই।
এদিকে দর্শনা থানায় ডাকাতির মামলায় ওসির চরম নির্যাতনের শিকার এবং ওসির বিরুদ্ধে আদালতে করা মামলার বাদী নিশান, সুজাত ও নইম হোসেন ছাড়াও আরেক আসামি আজিজুলসহ সাতজনকে এখন আসামি করা হয়েছে ঝিনাইদহ সদর থানার আগের আরেকটি ডাকাতি মামলায়।
অথচ তাদের পরিবারের ও সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাকাতি তো দূরের কথা এদের কারো বিরুদ্ধেই একটি সাধারণ ডায়েরিও নেই।
জানতে চাইলে ঝিনাইদহ থানার ওসি সোহেল রানা বলেন, খোঁজখবর না নিয়ে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে না। ওরা দর্শনা থানায় ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার ছিল এবং এরা একই চক্র।
বিষয়টি জানালে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, একটি ঘটনায় সাসপেক্টেড কেউ ধরা পড়লে পাশের তারাও চেষ্টা করে, তাদের কোনো মামলায় সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না। এ প্র্যাক্টিসটা আছে। এটা আমরাই প্রথম করেছি এমন না। তবে সমস্যা নেই, আমি কথা বলব।’
