সেপ্টেম্বর ৬, ২০২২, ১২:৩৩ এএম
জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতন ও মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টায় ব্যর্থ ওসি লুৎফুল কবীরের কর্মকাণ্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ। যদিও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই বলেই দায় সারছে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নির্দোষ মাদ্রাসাছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় নিয়ে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের ঘটনায় জনরোষের কবলে পড়তে পারেন ওসি— এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, গত ৩০ জুন দর্শনার গয়েসপুর-সড়াবাড়ি সড়কের শালিকচারা এলাকায় ডাকাতির ঘটনায় প্রকৃত ডাকাতদের আড়াল করতেই ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ওসি লুৎফুল কবীর। দর্শনা থানায় যোগদানের পর থেকেই সীমান্তের চোরাকারবারি, ডাকাত, চোরসহ সব অপরাধীর সঙ্গেই সখ্যতা গড়ে উঠেছে তার। তার প্রশ্রয়েই দর্শনা থানা এলাকায় ঘটছে সব অপরাধ।
সবশেষ গণডাকাতির ঘটনাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রকৃত ডাকাত চক্রের সঙ্গে তার আঁতাত রয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা। নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে প্রকৃত অপরাধীদের পার পাইয়ে দিতেই ওসির আসনে বসে নীরবে খেলে যাচ্ছেন লুৎফুল কবীর। আর ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন নিরীহদের। তার এসব অনিয়মের প্রধান সহযোগী ওই থানারই সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আহম্মেদ।
স্থানীয়রা বলছেন, গত ৩০ জুন গণডাকাতির ঘটনার সময় স্থানীয় বাজারে ছিলেন ওসির অমানবিক নির্যাতনের শিকার আন্দলবাড়িয়া এলাকার আজিজুল। চাচার সঙ্গে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে তার বাবাই ফোন করে জানান দর্শনার শালিকচারা এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। অথচ যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়— প্রবাদ বাক্যের আদলে আজিজুলের ক্ষেত্রেও সত্য রূপ দিয়েছেন ওসি লুৎফুল কবীর।
পরদিনই দর্শনা থানা পুলিশ বাড়ি থেকে আজিজুলকে ডাকাতির ওই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এমন হবে ঘুণাক্ষরেও তা কেউ ঠাওরই করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তাকে জড়ানো হয়েছে ঝিনাইদহ সদর থানার আরেকটি ডাকাতির মামলায়ও। পুলিশের পক্ষ থেকে এখন তকমা দেয়া হচ্ছে, আজিজুলসহ তার সঙ্গে ওসি লুৎফুল কবীরের নির্যাতনের শিকার বাকিরাও সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের সদস্য। দুই জেলার দুই ডাকাতির ঘটনাতেই নাকি তাদের যোগসাজশ পেয়েছে পুলিশ।
তবে কি ধরনের যোগসাজশ পেয়েছে, তা বলতে নারাজ পুলিশ।নির্বাক আজিজুলের পরিবার, শিক্ষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সহপাঠী ও সমাজের অন্যরাও বলছেন, আজিজুলের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ কিংবা আদালত তো দূরের কথা কখনো সামাজিকভাবেও বসতে হয়নি। অথচ তাকেই জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় নিয়ে নির্যাতন ও মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেন ওসি লুৎফুল কবীর। মূলত প্রকৃত ডাকাতদের আড়াল করতেই আজিজুলদের ফাঁসানোর পাঁয়তারা করছেন তিনি। আজিজুলদের এমন নির্যাতন করা হয়েছে যা কল্পনাতীত।
স্থানীয় মুরুব্বিরাও বলছেন, আমরা টিভির পর্দায় রিমান্ড দেখি। কিন্তু বাস্তবে এরকম ভয়ঙ্কর রিমান্ডের কথা কখনো শুনিনি।
আজিজুল ছাড়াও নির্যাতনের শিকার বাকিদের বিষয়েও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আদৌ কোনো অভিযোগ কিংবা চুরি-ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি ওসি লুৎফুল কবীরের থানাসহ চুয়াডাঙ্গার অন্য কোনো থানায় মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরির তথ্যও।
আন্দলবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ আতিয়ার রহমান বলেন, দর্শনা থানার ওসি লুৎফুল কবীর আন্দলবাড়িয়ার যে চারজন ছেলেকে ভোর রাতে তুলে নিয়ে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে জীবননগর কিংবা দর্শনা থানায় কোনো অভিযোগই নেই। তারা ছাত্র এবং বয়সে কম। আজিজুল ও নিশান একসাথে ফুটবল খেলতো। নিশান এসএসসি পাসের পর তার বাবার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করত। আজিজুল হক তার বাবার একমাত্র সন্তান। তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ নেই। আজিজুল আন্দলবাড়িয়া আশরাফিয়া আলিম মাদ্রাসার প্রথমবর্ষের মেধাবী ছাত্র এবং ওই মাদ্রাসা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। পড়াশুনার পাশাপাশি আজিজুল তার বাবার পেয়ারা ও মাল্টা বাগানের দেখাশুনা করত এবং ফুটবল খেলত।
নির্যাতনের শিকার নইম হোসেনের বাবা সেলিম হোসেন বলেন, আমার ছেলে ঢাকায় চাকরি করত। ডাকাতির ঘটনার পর সে বাড়িতে আসার দু-একদিন পরই পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং তিন দিন থানায় আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করে ওসি। ডাকাতির সময় বাড়িতে না থাকলেও তাকে স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য নির্মম নির্যাতন করে। আমি দর্শনা থানার ওসির সঠিক বিচার দাবি করছি।
এদিকে গণডাকাতির ঘটনায় ১৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেন ওসি লুৎফুল কবীর। এর মধ্যে আজিজুলসহ চারজনকে ৪৮ ঘণ্টা থানায় আটকে রেখে চরম অমানবিক নির্যাতন করেন। যদিও গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো আসামিকেই আদালতে তোলার নিয়ম রয়েছে। ওই চারজনকে কেন তিনি আদালতে না তুলে নিজ হেফাজতে রেখে নির্যাতন করেছেন; সে প্রশ্নের উত্তর তার অনিয়মের মধ্যেই ধরা পড়ে। নির্যাতনের সময় তিনি ওই চারজনের মুখ থেকে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি চান এবং দিতে না চাওয়ায় নির্যাতনের সর্বোচ্চ মাত্রা ব্যবহার করেছেন। এর একমাত্র কারণ প্রকৃত ডাকাতদের আড়াল করা।
যদিও এক্ষেত্রে আসামিদের ৪৮ ঘণ্টা নিজ হেফাজতে রাখতে উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিও নিয়েছিলেন কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে দর্শনাসহ সবকটি থানার অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) এমন অনিয়মের ঘটনা চুয়াডাঙ্গার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় গতকাল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. লুৎফর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ওই আদাশেও উল্লেখ করা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গার সব থানার অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) আইন লঙ্ঘন করে আটককৃত আসামিদের নিয়মিত আদালতে সোপর্দ না করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে উপস্থাপন করছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এর সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘনপূর্বক আসামিদের আইন বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করছেন। যা দেশের সংবিধান এবং প্রচলিত অন্যান্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পরবর্তীতে পুলিশ কর্তৃক ধৃত আসামিদের ক্ষেত্রে আইন বহির্ভূত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সহায়তা করার কোনো সংবাদ গোচরীভূত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের কারণে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করা হবে বলে জেলার সব থানার অফিসার ইনচার্জদের সতর্ক করা হয় ওই পত্রে।
মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইনের অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় তপসীলে বর্ণিত আইনের অধীনে কোনো অপরাধ, যা কেবল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য, তার সম্মুখে সংঘটিত বা উদঘাটিত হয়ে থাকলে তিনি ওই অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করে এ আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করতে পারবেন।’
কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় সবকটি থানা পুলিশ কর্তৃক ধৃত আসামিদের যে নিয়মে তা আইনের বিধান লঙ্ঘন। বিষয়টি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অফিস আদেশের ওই পত্র খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার ও সব থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
পূর্বেও অসংখ্য-অগণিত অনিয়ম-অপকর্মের হোতা ওসি লুৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবারও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি-না তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ। পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা ওসির আপন মামা হওয়ার সুবাদে ওই কর্মকর্তার সুনজরে থাকতে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধের কোনো অভিযোগই আমলে নিতে চান না। এমনি সংশ্লিষ্ট ডিআইজির দপ্তরেও তার বিষয়ে কথা বলতে চান না বলেও বলছেন স্থানীয়রা।

