সেপ্টেম্বর ৭, ২০২২, ১২:৫৯ এএম
পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার মামা পরিচয় দেয়া কর্মকর্তার পরোক্ষ প্রভাবে প্রভাবশালী; অপরাধীদের প্রশ্রয়দাতা দর্শনা থানার ওসি লুৎফুল কবীর। অসংখ্য অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এখনো অভিযোগহীন ফ্রেশ কর্মকর্তা। অথচ তিনি ওসি হিসেবে যোগদানের পর থেকেই নেতিবাচক ও অপ্রত্যাশিতভাবে পাল্টে গেছে সীমান্তবর্তী এ থানার দৃশ্যপট।
বর্তমান দৃশ্যপট এমন যে— সেখানে হত্যার ঘটনায় হয় অপমৃত্যুর মামলা, অপমৃত্যুর ঘটনায় হয় হত্যার মামলা। ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হন নিরীহরা। প্রকৃত ডাকাতদের আড়াল করতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ে বর্বরোচিতভাবে নির্যাতন করা হয় নিরীহদের। টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেয়া হয় হত্যার ঘটনা। সহজেই পরিবর্তন হয়ে যায় মামলা কিংবা বড় বড় ঘটনার মোটিভ। এসবই ওসি লুৎফুল কবীরের নির্দেশে হয় বলে জানায় একটি সূত্র।
এছাড়া অসংখ্য ষড়যন্ত্রমূলক মামলার নির্দেশ ও পরামর্শদাতাও এই ওসি। এপরও জবাবদিহিতা নয়, উল্টো বাহিনীর তরফ থেকে তাকে পুরস্কৃত করায় বেড়েই চলেছে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। সবশেষ আলোচিত গণডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং ওসির বিরুদ্ধে মামলা তারই প্রমাণ। ওসির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধানকালে স্থানীয় সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী গ্রাম ঠাকুরপুরের ফটিক, আসাদুল, চাকুলিয়ার রিকাব আলী ও সমশের, ফুলবাড়ীর মিলন, বড়বোলদিয়ার নজ্জেশ ও সুলতানপুরের মনসুর প্রকাশ্যে সীমান্ত চোরাকারবারে জড়িত।
এদের সবাই ওসি লুৎফুল কবিরের সাথে সখ্য থাকায় কোনো রকমের জটিলতা ছাড়াই বীরদর্পে মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্রের চোরাচালান করছে। থানার এসআই আহম্মদ সার্বক্ষণিক তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং চোরাচালানের নির্ধারিত অর্থ আদায় করে ওসির হাতে তুলে দেন। কখনো কখনো ওসি নিজেই এসব অর্থের লেনদেন করছেন। এসআই আহম্মদ শুধু চোরাচালানের অর্থ সংগ্রহই নয়, ওসির সব অনিয়মের বাস্তবায়নও করে থাকেন। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই অস্ত্রের চোরাচালানসহ মাদক, স্বর্ণ ছাড়াও যাবতীয় চোরাচালান দেশে ঢুকছে অবাধে।
গত ২১ এপ্রিল রাজধানীর পল্লবী থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সীমান্ত থেকে আনা অস্ত্রের চালানসহ এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে সেই ব্যবসায়ী পুলিশকে জানায়, দেশের সীমান্তবর্তী অন্যান্য জেলার মতো চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়েও দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। এরপর থেকেই অস্ত্রের চোরাচালান বিষয়ে দর্শনা থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও ওসি লুৎফুল কবীর এ বিষয়ে নির্বিকার। সে সময় তার কাছে জানতে চাইলে উপরোল্লিখিত সব অভিযোগই অস্বীকার করেন তিনি।
সীমান্ত ঘুরে এবং সীমান্তের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দর্শনা সীমান্তে চোরাকারবারে গড়ে উঠেছে ওসি লুৎফুল কবিরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা কামারপাড়ার আলীম, মান্নান, ডালিম ও বাড়াদির মিস্টার। এদের মাধ্যমেই চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন ওসি। মদনা ইউপি সদস্য খায়রুল মেম্বার সম্প্রতি ১৫ কেজি স্বর্ণসহ গ্রেপ্তার হন। অথচ টাকার বিনিময়ে দফারফার কারণে জামিনযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করে চালান করায় ফের জামিনে বেরিয়ে এসে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্রের চোরাচালান রোধে সোর্স হিসেবে কাজ করতেন উপজেলার নাস্তিপুরের হজরত। সেই হজরতকেই গভীর রাতে গুলি করে হত্যা করা হয়। হজরত হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
হজরত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয়রা বলছেন, চোরাচালানের পথ নির্বিঘ্ন করতেই হজরতকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যে কারণে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের না ধরে হত্যার দায় চাপিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তার ভাতিজা জসিমকে। জসিমের সাথে হজরতের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। আবার মদনা বাড়ির মনির মিস্ত্রি নামে আরেকজনকেও একই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অথচ দুজনই স্থানীয়ভাবে নিরীহ মানুষ হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ওসি লুৎফুল কবীরই এ ঘটনার নেপথ্য নায়ক। চোরাকারবার বহাল রাখতেই হজরতকে মার্ডার করা হয়। আবার প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতেই গ্রেপ্তার দেখানো হয় জসিম ও মনির মিস্ত্রিকে। স্থানীয়রা আরও বলছেন, শুধু এক-দুটি অভিযোগ নয়, গুরুতর অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে। বিয়ের পর আরামডাঙ্গার নিলুফা বেগমের মেয়ে রীনার পেটে লাথি দিয়ে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করে স্বামী একরামুল। একরামুলের বাড়ি উপজেলার বুইচিতলা গ্রামে। সেই ঘটনায় রীনা মামলা করতে চাইলেও ওসির নির্দেশে মামলা নেয়নি তার সব অনিয়ম ও কুকর্মের সমন্বয়ক এসআই আহম্মদ।
এছাড়াও দর্শনা থানায় এমন একটি দিন নেই যেদিন চুরির ঘটনা ঘটছে না। স্থানীয়রা বলছেন, কৃষকদের সেচের মোটর চুরি হচ্ছে, পুলিশ এসব বিষয়ে নির্বিকার। সবমিলিয়ে দর্শনার বাসিন্দাদের জানমালের কোনো নিরাপত্তাই মিলছে না ওসির অবহেলায়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেয়ে পরোক্ষভাবে চোরকারবারে জড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি এখন উপজেলার প্রতিটি গ্রামে গড়ে উঠেছে মাদকের অভয়ারণ্য। যুবসমাজও আজ ধ্বংসের পথে। পুলিশি ব্যবস্থার এমন বেহাল দশার বিরুদ্ধে ভয়ে মুখও খুলছেন না অভিভাবকরা।
তারা বলছেন, দর্শনার সর্বত্রই আজ হাত বাড়ালেই মিলছে ফেন্সিডিল, গাঁজাসহ সব ধরনের মাদক। এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়তে হয়নি দর্শনাবাসীকে— এমনটাই বলছেন তারা। তবে সাধারণ মানুষ কেউ সাহস করে মুখ খুলতে না পারলেও কিছুদিন আগে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাংসদ (সাবেক হুইপ) ছোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন পুলিশের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছেন, চুয়াডাঙ্গার এমন একটি গ্রাম নেই যেখানে মাদকের থাবা নেই। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে মদ পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
দর্শনার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির নেপথ্যে গুটিকয়েক রাজনীতিবিদও রয়েছেন বলে জানা গেছে স্থানীয় সূত্রে। সরাসরি ওসির সংশ্লিষ্টতায় মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্রের চোরাকাবারিদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে দু-একজন স্বচ্ছ সমাজসেবী কিংবা রাজনীতিবিদ কথা বললেও তাদের অপমান-অবজ্ঞা করে কথা বলছেন ওসি। বিশেষ করে আওয়ামী রাজনৈতিক নেতাদের তিনি গাছের ছায়া মনে করেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের গোনার টাইমও নাকি তার নেই। বর্তমান সরকারের যেকোনো লোককেও তার গোনার টাইম নেই।
এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে তার জন্মস্থান সাতক্ষীরার তালাধীন তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের লাউতলা গ্রামের স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলে বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ পান লুৎফুল কবীর। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য হাবীবুল ইসলাম হাবীবের তদবিরেই নিয়োগ পান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, তৎকালে তালা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের প্রকাশ্য ক্যাডার ছিলেন লুৎফুল কবীর। সে সময় তার সাথে ছাত্র রাজনীতি করতেন তারই বন্ধু আব্দুল গাফফার। যিনি বর্তমানে মালয়েশিয়া যুবদলের সক্রিয় কর্মী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই লুৎফুল কবীর রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে নিয়োগ পেলেও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান আব্দুল গাফফার। আব্দুল গাফফার মাঝে মাঝেই দেশে আসেন এবং গোপনে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন লুৎফুল কবীর।
অন্যদিকে যার সুপারিশে তার পুলিশে নিয়োগ হয় সেই সংসদ সদস্য হাবীবুল ইসলাম হাবীব বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা-মামলায় কারাগারে রয়েছেন। সে সূত্রে এখনো বিএনপি-জামায়াতের সাথে সখ্য রয়েছে লুৎফুল কবিরের। তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন কৌশলে। তালার স্থানীয় একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করে।
এদিকে অপরাধ দমনের দায়িত্ব নিয়ে নিজের আখের গোছাতেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো আঁচ করতে না পারলেও তদন্তে এসবের সত্যতা মিলবে বলে দাবি করছে সূত্রটি।


