বাগেরহাট প্রতিনিধি
জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ অবকাঠামো বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে হঠাৎ করেই এক নজিরবিহীন ও রহস্যজনক ঘটনা ঘটেছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থল ছেড়ে নিজ দেশ ভারতে ফিরে গেছেন কেন্দ্রের ৯ জন উচ্চপদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তা।
শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই অতি গোপনীয়তায় সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।
এ কর্মকর্তারা সবাই ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) থেকে প্রেষণে বাংলাদেশে দায়িত্বরত ছিলেন। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এভাবে দেশ ত্যাগের ঘটনায় প্রকল্প এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, শনিবার সকালে প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী নাস্তার টেবিলে ওই কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি দেখে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। সাধারণত জেনারেল ম্যানেজার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আবাসিক এলাকা মুখর থাকে। দীর্ঘক্ষণ তাদের সন্ধান না পেয়ে খোঁজখবর শুরু হলে জানা যায়, তারা তাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি নিয়ে একে একে ভোরের অন্ধকারেই ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন।
পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তারা সড়কপথে সাতক্ষীরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেছেন। হঠাৎ দেশ ত্যাগের কারণ জানতে প্রকল্প পরিচালক রামানাথ পুজারী ওই কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। তবে এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রের উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজিম সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসারসহ সুসংগঠিত চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সংকট থাকার প্রশ্নই আসে না। এর আগে কখনোই এই কর্মকর্তারা নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেননি কিংবা লিখিত বা মৌখিকভাবে কোনো অভিযোগ জানাননি। ফলে হঠাৎ এই অজুহাত তুলে চলে যাওয়াকে অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা রহস্যজনক বলে মনে করছেন।
যারা কাউকে না জানিয়ে প্রেষণ ত্যাগ করেছেন তারা হলেন, জেনারেল ম্যানেজার প্রতিম ভর্মন, জেনারেল ম্যানেজার বিশ্বজিৎ মণ্ডল, জেনারেল ম্যানেজার এন সুরায়া প্রকাশ রায়, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ইমানুয়েল পনরাজ দেবরাজ, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সুরেয়া কান্ত মন্দেকার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সুরেন্দ্র লম্বা, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার অনির্বাণ সাহা, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার কেশবা পালাকি ও সহকারী জেনারেল ম্যানেজার পাপ্পু লাল মিনা।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এভাবে প্রোটোকল ভেঙে চলে যাওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়। বিশেষ করে যখন ৯ জন কর্মকর্তা একত্রে একই সময়ে সীমান্ত পাড়ি দেন, তখন এর পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে, তার কোনো প্রভাব এই ঘটনার পেছনে রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি সূত্র জানায়, ওই কর্মকর্তারা গত কয়েকদিন ধরেই নিজেদের মধ্যে অনেকটা সংকুচিত ছিলেন। তবে কর্মক্ষেত্রে তাদের পেশাদারিত্বে কোনো ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ গতকাল ভোরে তারা নিজস্ব ব্যবস্থায় যেভাবে সীমান্ত পার হয়েছেন, তা অনেকটা পলায়ন এর মতো দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। এ ঘটনায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিষয়টি ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই রহস্যজনক প্রস্থানের নেপথ্য কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ দ্বিপাক্ষিক প্রোটোকলের পরিপন্থী কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আপাতত কর্মকর্তাদের শূন্যতা কাটিয়ে কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তবে এই ঘটনাটি যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনা এবং দুই দেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
ইএইচ