সুমন মোল্লা, পাথরঘাটা (বরগুনা)
মে ১০, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
বরগুনার পাথরঘাটায় অবস্থিত হরিণঘাটা পর্যটনকেন্দ্র এখন প্রায় পর্যটকশূন্য। একসময় প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়ে মুখর এই দর্শনীয় স্থানটি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার অভাবে ক্রমেই দর্শনার্থী হারাচ্ছে। ভ্রমণে এসে নানা ভোগান্তির মুখে পড়ে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা হরিণঘাটা এলাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। বনের ভেতরে নির্মিত প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতার পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে বিস্তীর্ণ সবুজ বন উপভোগ করা যায়। আঁকাবাঁকা ফুট ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন গভীর অরণ্যের অনন্য অভিজ্ঞতা।
এছাড়া লালদিয়ার চর, যেখানে বিষখালী নদী, বলেশ্বর নদী এবং বঙ্গোপসাগর মিলিত হয়েছে, পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের মায়াবী দৃশ্য যে কোনো ভ্রমণপিপাসুর মন কেড়ে নেয়।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পর্যটনকেন্দ্রটির অবস্থা এখন নাজুক। পর্যটকদের চলাচলের জন্য নির্মিত ফুট ট্রেইলের কাঠের পাটাতন পচে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। ফলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় অনেকেই ট্রেইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকছেন।
এছাড়া বনের ভেতর দিয়ে লালদিয়া সমুদ্র পর্যন্ত যাওয়ার জন্য নির্মাণাধীন ফুট ট্রেইলের ব্রিজ দীর্ঘদিন ধরে অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরু হলেও দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণ শেষ হয়নি। ইতোমধ্যে নির্মিত অংশের কাঠামোও নষ্ট হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
পর্যটকপ্রেমী আরিফুর রহমান বলেন, “জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন হলেও এই পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন হয়নি। বরং যেসব কাজ হয়েছে, তাতেও অনিয়মের ছাপ রয়েছে। নেটওয়ার্ক নেই, ভাঙা ব্রিজ- সব মিলিয়ে জায়গাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।”
আরেক পর্যটক মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ জানান, “প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ হলেও অবকাঠামোর অবস্থা খুব খারাপ। শিশু ও নারীদের নিয়ে এখানে আসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শোনা যাচ্ছে, অনেকেই এখানে ঘুরতে এসে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।”
এ অঞ্চলে হিংস্র প্রাণী না থাকলেও হরিণ, বানর, শূকর, গুইসাপসহ প্রায় ২৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। পাশাপাশি ৭০ থেকে ৮০ প্রজাতির পাখি, অসংখ্য প্রজাপতি ও ফড়িং এই বনাঞ্চলকে করেছে আরও জীবন্ত ও আকর্ষণীয়।
জানা যায়, ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে হরিণঘাটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকোটুরিজম উন্নয়নের লক্ষ্যে এই পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণ করে বন বিভাগ। তবে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এর অবস্থা বেহাল।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল জানান, “হরিণঘাটা পর্যটনকেন্দ্রের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। উন্নয়ন কাজের জন্য ইতোমধ্যে কিছু বরাদ্দ এসেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত সংস্কার, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানসম্মত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হলে হরিণঘাটা পর্যটনকেন্দ্রটি আবারও তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে পারে। অন্যথায়, সম্ভাবনাময় এই পর্যটন স্পটটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এএন