অধ্যাপক ডা. এ জেড এম মাইদুল ইসলাম
জুলাই ১২, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ছাগল বিতরণ (গবাদিপশুপালন) ও ফ্যামিলি কার্ড প্রচলন- এ শব্দগুলো বা লাইনটি আমাদের সবারই চেনা ও জানা। সাধারণভাবে চিন্তা করলে এগুলো কয়েকটি উদ্যোগ বা কর্মসূচি মাত্র।
কিন্তু আসলে প্রতিটি উদ্যোগ একটি উন্নত জীবনমান গড়ার দর্শন ও কর্মসূচি, বিশেষ করে আমাদের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সম্পদশালী দেশের ক্ষেত্রে। ভাবতে অবাক লাগে, কী করে একটি পরিবারে পিতা, মাতা ও পুত্রের চিন্তাধারা একই সূত্রে গ্রথিত হয়ে উন্নত, সমৃদ্ধশালী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণে হাতছানি দিচ্ছে।
ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানুষের সংখ্যা যত বেশি, দৈনন্দিন সমস্যাও তত বেশি। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। তদুপরি সমাজের বিশৃঙ্খলা, আইন না মানার প্রবণতা, দুর্নীতি ও ন্যায়বিচারের অভাব সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করে তুলছে। বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে, যারা সত্যি সত্যিই খুবই পরিশ্রমী।
স্বাধীনতার পরবর্তীকাল থেকে শহরভিত্তিক কিছু উন্নয়ন হলেও গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থা শোচনীয়। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ এবং বাংলাদেশের জমি খুবই উর্বর। তাই শস্যফলন আগের চেয়ে বেশি হলেও কৃষি আবাদি জমি বৃদ্ধি পায়নি। বরং সময়ের অতিক্রমে ও বংশবৃদ্ধির ফলে কোনো পরিবার বা ব্যক্তির জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই গ্রামের জনপদে আয়-রোজগারও সীমিত হয়ে আসছে বা কমছে। এটিই গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তবচিত্র।
কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর এক বা একাধিক চিন্তাশীল ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের জনহিতকর, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাভাবনা তথা স্বপ্ন বা জীবনদর্শন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সে জাতির কাঙ্ক্ষিত আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জাতিসত্তা পরিস্ফুটিত হয়ে থাকে। অতীতে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও সদ্যপ্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ ও ছাগল পালন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নানাবিধ কারণে এ কর্মসূচিগুলো তত সুফল বয়ে আনতে পারেনি। তার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকের অনাগ্রহ ও অবহেলা পরিলক্ষিত হয়েছে।
উপরন্তু স্থানীয় জনগণকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করে নির্লিপ্ত করে রাখার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। যার ফলে প্রকল্পগুলো পূর্ণ সফলতা পায়নি, টেকসই হয়নি এবং জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পায়নি। বর্তমানেও সরকারপ্রধান ঘোষিত নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ ও ফ্যামিলি কার্ড প্রচলন প্রকল্পগুলো সমাজের অনেকের কাছেই অপছন্দনীয়।
নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনা, এমনকি প্রকল্পগুলোকে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব বলেও মনে করছেন অনেকে। আসলে এই কর্মসূচিগুলোর গুরুত্ব ও গভীরতা অনেকেই অনুভব করতে পারছেন না। যেহেতু বাংলাদেশের ৮০ ভাগ লোক গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষিনির্ভর, তাই আধুনিক চিন্তাধারা ও কৃষিপ্রযুক্তির প্রসার ও উন্নয়ন ছাড়া সমৃদ্ধ বা স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, নদী-খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তারই ইঙ্গিত বহন করছে। দেশ বা জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে সে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, সংস্কৃতি এবং নিজেদের সম্পদ ও জনশক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবমুখী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নই অধিক ফলপ্রসূ ও কল্যাণকর। আর সেটা না করতে পারলে কোনো জাতি তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সফলতা অর্জন করতে পারে না। পূর্ব বাংলা তথা আমাদের দেশের জনগণের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, সংগ্রাম ও তার সফলতার অনেক নজির রয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালে শহীদ মেজর জিয়াউর রহমানের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা ও আন্দোলনের ডাক এবং সর্বস্তরের জনগণের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত ফসল আজকের বাংলাদেশ। তাই একই ছাতার নিচে তিনটি প্রকল্প যথা- ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড বিতরণ, নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণসহ ছাগল বিতরণ (গবাদিপশুপালন) প্রকল্প, যা প্রকৃত অর্থে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও ফলপ্রসূ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ দপ্তর/অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট যেসব প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, কেন্দ্র বা গবেষণাগার রয়েছে, তাদের আন্তরিক সহযোগিতা ও সবার অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। সর্বোপরি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে কর্মসূচিগুলোর প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা ও গুরুত্ব সঠিকভাবে অবহিত করা এবং তাদেরকে কাজগুলোতে সম্পৃক্ত করা অবশ্যই জরুরি। যা অতীতে খুব একটা পরিলক্ষিত হয়নি।
জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া এ কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন ও ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। জনগণকে অবশ্যই বোঝাতে হবে এবং জনগণকেও বুঝতে হবে- বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, পার্শ্ববর্তী দেশের বিরূপ মনোভাব ও আচরণ, তদুপরি আমাদের নিজেদের কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের দরুন আমাদের দেশের নদী, খাল-বিলগুলো দূষিত, ভরাট ও পানিশূন্য হয়ে মৃতপ্রায়।
ফলস্বরূপ দেশ শুধু নদী, খাল-বিলের বহুমুখী উপকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না, বরং নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি মরুকরণের প্রভাবে কৃষি ফসলাদি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আবহমানকালের সুজলা-সুফলা বৈচিত্র্য বিলীন হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পানিই জীবন। ইতিপূর্বে অন্য একটি প্রবন্ধে আলোচনা করেছিলাম, “নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। নদীই বাংলাদেশের প্রাণ।”
প্রকল্পগুলো ও লেখকের ভাবনা
ফ্যামিলি কার্ড/কৃষি কার্ড
কার্ডগুলো শুধু সাধারণ কার্ড হিসেবে বিবেচিত ও তৈরি না করে প্রতিটি ফ্যামিলি কার্ড এক একটি পারিবারিক জাতীয় তথ্যভান্ডার হওয়া উচিত। উক্ত কার্ডে কার্ডধারীর নাম, জন্মতারিখ, জন্ম ঠিকানা, নিজস্ব বসতবাড়ির মালিক বা ছিন্নমূল, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ছেলে-মেয়ের সংখ্যা এবং ছেলে-মেয়েদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বর্তমান পেশা অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে। এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণপূর্বক শুধু তাদের মাসিক ভাতার ওপর নির্ভরশীল না করে প্রত্যেক পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিদের সরকারি উদ্যোগে ও সহযোগিতায় বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ (Vocational Training)-এর মাধ্যমে তাদেরকে উপার্জনকারী (Earning Member) হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উল্লেখ্য যে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের যোগ্যতা অনুসারে দেশে বা বিদেশে চাকরি বা ব্যবসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা কলেজ, স্কুল বা মাদ্রাসা আছে, সেগুলোকে খণ্ডকালীন বা বৈকালিক কারিগরি প্রশিক্ষণ (Vocational Training) কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে আলাদা অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে না। বিগত বছরগুলোতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু কৃষি উৎপাদনের কথা ভাবা হয়েছে।
বর্তমানে গ্রামীণ বড় বড় হাট-বাজার বা বন্দরগুলো মূলত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে সমবায়ভিত্তিক ছোট ছোট কলকারখানা স্থাপন করা সম্ভব। যেখানে ছোট ছোট কৃষিযন্ত্রপাতি, নাট-বল্টু, তালা, সিটকিনি ও স্যানিটারি সরঞ্জাম ইত্যাদি তৈরি করা যেতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নদী-খাল খনন
বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তন ও অতিমাত্রার খরার প্রভাবে সময়ে-অসময়ে অতিবৃষ্টি, উপরন্তু পার্শ্ববর্তী দেশের বিরূপ প্রভাব ও আচরণে বাংলাদেশের নদী, খাল-বিলগুলো শুকিয়ে মৃতপ্রায় হওয়ায় অকস্মাৎ ভয়াবহ বন্যায় জানমালের ক্ষতি হয়। নদীভাঙনের ফলে অনেক মানুষ সম্পদহীন, গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে উদ্বাস্তুর মতো বিভিন্ন শহরে বসবাস করছে। ফলস্বরূপ পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপ দিন দিন বেড়েই চলছে। সর্বোপরি নদী, খাল-বিলের বিভিন্ন ধরনের উপকারিতা থেকে দেশ বঞ্চিত হয়ে দুর্ভোগে পড়ছে। প্রবহমান জলধারা অর্থাৎ সমুদ্র, নদী-নালা সুখময় জীবন ও শান্তির জন্য আল্লাহর এক অতুলনীয় নিয়ামত।
বিশ্বের অনেক দেশে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে খাল, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাধার তৈরি করা হয়ে থাকে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আল্লাহপ্রদত্ত নদ-নদী, খাল-বিলকে নানাভাবে দূষিত ও নদীর প্রবাহ বন্ধ করছি। বর্তমান সরকারের নদী-খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবে এ কর্মসূচিকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করে মডেল হিসেবে বাস্তবায়নই হবে অধিকতর ফলপ্রসূ। অতীতে খাল খনন করে উত্তোলিত মাটিগুলো খালসংলগ্ন জমিতেই উঁচু করে বাঁধের মতো রাখার ফলে বর্ষা মৌসুমে এ মাটিগুলো অতিসহজে খাল বা নদীতে পড়ে তা ভরাট করে ফেলে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে পরিত্রাণের জন্য খনন প্রক্রিয়ার নকশা প্রণয়নে আমার একটি নিজস্ব ভাবনা বা মডেল রয়েছে, তা নিচে উল্লেখ করলাম-
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও সফলতার তারিখটিকে তথা ০৫-০৮-২০২৪ স্মরণার্থে নদী-খাল খনন প্রক্রিয়ার নকশা প্রণয়ন ও মডেল তৈরিতে ৮, ৫ ও ২০২৪ সংখ্যাগুলোকে পরিমাপের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই সংখ্যাগুলোর প্রয়োগে নদী বা খালের প্রশস্ততা ও সংলগ্ন প্রাপ্য জমির পরিমাণ অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য। উল্লেখ্য, সর্বক্ষেত্রেই এই পরিমাপটি গ্রহণ ও ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। সাধারণত নদী বা খাল-বিলে তলদেশ (Main Stream), গভীরতা এবং ঢালু বা উঁচু পাড় থাকে। প্রস্তাবিত নকশায় নদীর তলদেশ বা Main Stream ৮ ফুট গভীর, প্রতি পাশে ৫-৮ ফুট করে চওড়া বারান্দা বা তাক, ১৩ ফুট (৫+৮) উঁচু করে ৪০ ফুট চওড়া দুই পাশে দুই পাড় থাকবে।
এক পাশে ভূমিহীনদের বসতবাড়ি ও পারিবারিক খামার (হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল) থাকবে। অন্য পাশে গাছপালা, মক্তব, মাদ্রাসা, স্কুল ও চলাচলের রাস্তা থাকবে। এক পাড় থেকে অপর পাড়ে যাওয়ার জন্য ২০২৪ ফুট পরপর নদীগুলোর ওপর সাঁকো থাকবে, যা চলাচলের সুবিধা করবে। খননকৃত খাল বা নদীগুলো জলাধার হিসেবে সেচকাজ, মৎস্য উৎপাদন ও নৌপথের ব্যবসা-বাণিজ্যের সহায়ক হবে। ওপরোক্ত ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নগতি থেকে সুরক্ষা দেবে এবং আর্সেনিকসহ অন্যান্য পানি দূষণ থেকে দেশকে রক্ষা করবে। যার ফলে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে এবং দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সহায়ক হবে।
ছাগল বিতরণ বা গবাদিপশুপালন
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থান গবাদিপশু পালনের জন্য খুবই উপযোগী। এ খাতটি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনসহ দেশীয় অর্থনীতির উন্নয়নে বিরাট সহায়ক সম্পদ হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডধারী ও তার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জনের জন্য তাদের মধ্যে ছাগল বা গবাদিপশু পালনে সহায়তা দিতে হবে। অঞ্চল ও গ্রামভিত্তিক গবাদিপশু পালনে ছোট ছোট আদর্শ খামার তৈরি করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, ছাগল পালনে খরচ কম হয়। বিশেষ করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল দেশের আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে। প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময়ে কোরবানি উপলক্ষে সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মক্কায় হজের সময়ে কোরবানির সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ লাখেরও বেশি। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে আমরা যদি অন্তত ২ লাখ ছাগল রপ্তানি করতে পারি এবং প্রতি ছাগলের গড় মূল্য ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা হয়, তবে এখান থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এ ছাড়া ছাগলের চামড়ার গুণগত মানের জন্য বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা রয়েছে। সৌদি আরবে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ট্যানারি স্থাপন করে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি ও বিক্রি করে লাভবান হওয়া যেতে পারে।
বৃক্ষরোপণ
মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য পানি যেমন অপরিহার্য, তেমনি বৃক্ষ, লতাপাতা ও উদ্ভিদও মহান আল্লাহ তাআলার এক অপরিহার্য সৃষ্টি। মানুষের জীবনধারণ ও পরিবেশ রক্ষায় গাছপালা বা বৃক্ষের অবদান অপরিসীম। পৃথিবীর বৃহত্তম অরণ্যাঞ্চল আমাজনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়। আমরা সবাই জানি, জীবনধারণের জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন অপরিহার্য। আর গাছপালাই আমাদের সেই বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিয়ে থাকে।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, যেসব দেশ বা অঞ্চলে পাহাড় ও বন-জঙ্গল বেশি, সেখানে বৃষ্টিপাতও বেশি হয়। একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য সে দেশের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা গাছ রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে বৃক্ষনিধনে বেশি অভ্যস্ত। অথচ গাছের উপকারিতা অপরিসীম। ফলজ গাছ নানা ধরনের ফলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দেয়। আর ঔষধি গাছ বিভিন্ন ধরনের ওষুধের উপাদান হিসেবে আমাদের রোগব্যাধি নিরাময়ে সহায়তা করে থাকে। জীবনপ্রবাহ সচল ও সুস্থতা রক্ষায় গাছপালা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের অবদান অপরিসীম ও অপরিহার্য।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ছাড়াও গাছ একটি অর্থকরী সম্পদ। বৃক্ষরোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সদকায়ে জারিয়াও বটে। বিগত বছরগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষার জন্য এ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। তখন স্লোগান ছিল, “গাছ লাগাও, পরিবেশ বাঁচাও, দেশ বাঁচাও।” সুতরাং বর্তমান সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে হেলা-অবহেলা না করে সফল করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
আগামীর উন্নত, সমৃদ্ধশালী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই কর্মসূচিগুলোর সঠিক বাস্তবায়নই হতে পারে আসল চাবিকাঠি।
লেখক: চিকিৎসক, সাবেক চেয়ারম্যান, চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (পিজি হাসপাতাল) এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শিবগঞ্জ উপজেলা (বগুড়া) কল্যাণ সমিতি, ঢাকা।
এএন