আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
এক বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং আইনি জটিলতা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ত্যাগ করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে শুরু হওয়া এ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া গতকাল বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) এবং দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।
এর মাধ্যমে কয়েক দশকের পুরনো এক অংশীদারিত্বের অবসান ঘটল, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ডব্লিউএইচও তার মূল আদর্শ এবং লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এইচএইচএসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সংস্থাটি প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ওয়াশিংটনের মতে, কোভিড-১৯ বা করোনা মহামারির শুরুতে ডব্লিউএইচও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে অপ্রয়োজনীয় দেরি করেছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে প্রাণহানি বেড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, সংস্থাটি চীনের প্রভাবে প্রভাবিত এবং অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচওতে সবচেয়ে বেশি অনুদান দিলেও সংস্থাটির ইতিহাসে কোনো মার্কিন নাগরিক মহাপরিচালক হতে পারেননি।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ সংস্থা ত্যাগ করতে চাইলে এক বছর আগে নোটিশ দিতে হয় এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ সময়কালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৭ কোটি ডলারেরও বেশি অনুদান বকেয়া রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ অর্থ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এইচএইচএসের কর্মকর্তাদের মতে, ডব্লিউএইচওর সংবিধান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আইনগতভাবে এ অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য নয়। এ অবস্থানটি জেনেভা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন আইনি লড়াইয়ের জন্ম দিতে পারে।
হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে যে, ডব্লিউএইচও থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে তার নেতৃত্ব বজায় রাখবে। তবে সেটি হবে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে, কোনো বহুজাতিক সংস্থার অধীনে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের (এইচএইচএস) বর্তমানে ৬৩টি দেশে দুই হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন।
বিশ্বের শতাধিক দেশের সাথে সরাসরি স্বাস্থ্য বিষয়ক চুক্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ওয়াশিংটন পরিকল্পনা করছে, রোগ পর্যবেক্ষণ, রোগনির্ণয় এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা এ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলোকেই কাজে লাগাবে।
ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও তারা নিয়ম অনুযায়ী এগোবে। সংস্থার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে নির্বাহী বোর্ডের সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে এবং পরবর্তী দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ৬৬টি সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের ফলে ডব্লিউএইচও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বে। কারণ সংস্থাটির বাজেটের একটি বড় অংশ আসত ওয়াশিংটন থেকে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এককভাবে জনস্বাস্থ্যে কাজ করতে চায়, তবে মহামারি বা সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক তথ্য আদান প্রদান ব্যাহত হতে পারে।
তবে ট্রাম্প সমর্থকরা মনে করছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থের সাশ্রয় হবে এবং দেশটি নিজস্ব এজেন্ডা অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য নীতি পরিচালনা করতে পারবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্থান কেবল একটি দেশের সদস্যপদ ত্যাগ নয়, বরং এটি বহুজাতিক বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক বড় ধাক্কা। একদিকে ডব্লিউএইচও সংস্কারের চাপে পড়বে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে আন্তর্জাতিক সংস্থার বাইরে থেকেও তারা বৈশ্বিক মহামারি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম।
ইএইচ