আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আবারও তার সাম্প্রদায়িক ও বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে সংবাদ শিরোনামে এসেছেন।
তিনসুকিয়া জেলার ডিগবয়ে এক সরকারি অনুষ্ঠানের ফাঁকে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি সরাসরি ‘মিঞা’ (বাংলাভাষী মুসলমান) সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানান। তিনি বলেন, আসামে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলাকালীন ৫ লাখ মিঞা ভোটারের নাম বাদ দেওয়া তার সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
নির্বাচনী রাজনীতিতে ভোট চুরির অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা চরম ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, ভোট চুরি মানে হলো আমরা কিছু মিঞা ভোট চুরি করার চেষ্টা করছি। আদর্শগতভাবে তাদের আসামে নয়, বাংলাদেশে ভোট দিতে দেওয়া উচিত।
তার এ বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশি হিসেবেই বিবেচনা করেন।
হিমন্ত আরও দাবি করেন যে, চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার মুসলমানকে যে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, তা পরিকল্পিত। তার ভাষায়, আমরা নিশ্চিত করছি যেন তারা আসামে ভোট দিতে না পারেন।
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, কংগ্রেস বা বিরোধীরা তাকে গালি দিলেও তিনি তার অবস্থান থেকে সরবেন না। তিনি বলেন, কংগ্রেস আমাকে যত খুশি গালি দিক। আমার কাজ হলো, মিঞা মানুষকে কষ্টে রাখা।
এর আগেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বিজেপি সরকার আইনের কাঠামোর মধ্যেই এ সম্প্রদায়ের জন্য উৎপাত বা বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। আজকের বক্তব্যে তিনি সেই পুরনো বিদ্বেষেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন।
বর্তমানে ভারতের নির্বাচন কমিশন ১২টি রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পরিচালনা করছে। তবে আসামের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়াটি সাধারণ হালনাগাদের চেয়ে অনেক বেশি কড়াকড়ি।
হিমন্ত বলেন, এখনকার সংশোধন তো কেবল প্রাথমিক মাত্র। যখন আসামে পুরোদমে এসআইআর শুরু হবে, তখন ৪ থেকে ৫ লাখ মিঞা ভোট বাদ দিতে হবে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা অনুযায়ী, আসামে ২ কোটি ৫১ লাখ ভোটারের মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ ভোটারকে মৃত বা স্থানান্তরিত দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় কেবল মুসলিম নামগুলোকেই টার্গেট করা হচ্ছে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এ বক্তব্যের পর আসামের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। রাইজর দলের সভাপতি ও বিধায়ক অখিল গগৈ বলেন, মিঞা জনগোষ্ঠীকে চাপে রাখার জন্য জনগণ তাকে মুখ্যমন্ত্রী করেনি।
তার এ বক্তব্য সংবিধানের পরিপন্থী। কংগ্রেস নেতা আমান ওয়াদুদ অভিযোগ করেছেন যে, মুখ্যমন্ত্রী আসামে ভারতীয় সংবিধানকে পুরোপুরি অকার্যকর করে তুলেছেন।
এর আগে রোববার কংগ্রেস, সিপিআই এমসহ ছয়টি বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে অভিযোগ করেছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রকৃত ভোটারদের হয়রানি করা করা হচ্ছে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার জন্য এমন বিতর্ক নতুন কিছু নয়।
গত বছর তিনি বলেছিলেন যে, আদমশুমারিতে যারা মাতৃভাষা বাংলা লিখবে, তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। মুসলিম ও বাংলাভাষীদের প্রতি তার এ ধারাবাহিক নেতিবাচক মনোভাব দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একজন সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীকে অন্য দেশে গিয়ে ভোট দিতে বলা বা তাদের কষ্টে রাখার ঘোষণা দেওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। ভারতের নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রীয় সরকার এ বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এ পরিস্থিতির প্রভাবে আসামে বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাভাষী মানুষের নাগরিকত্বের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
ইএইচ