আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই পারমাণবিক কূটনীতির এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায় শুরু হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর কাছে একটি ‘ব্যক্তিগত বার্তা’ পাঠিয়েছেন, যা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। জর্ডানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়া নিউজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এই বিশেষ সফরের নেপথ্য কাহিনী প্রকাশ্যে এনেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি সম্প্রতি মস্কোতে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল খামেনির একটি বিশেষ প্রস্তাব পুতিনের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রাশিয়ায় পাঠানোর প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই পদক্ষেপটি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক সমঝোতা বা জেসিপিওএ (JCPOA)-এর শর্তাবলীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তেহরান বিশ্ববাসীকে এই বার্তা দিতে চায় যে, তারা আলোচনার মাধ্যমে একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ে ওয়াশিংটন যখন তেহরানকে কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, ঠিক তখনই ইরান রাশিয়ার মাধ্যমে একটি মধ্যস্থতার পথ খুঁজছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তাঁরা সমাধানে পৌঁছাতে আশাবাদী হলেও ওয়াশিংটনের ওপর তাঁদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। কারণ হিসেবে তিনি অতীতের চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন।
ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার বিপক্ষে। পরিবর্তে তারা একটি আঞ্চলিক পারমাণবিক কনসোর্টিয়াম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
লক্ষ্য: এই কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ইরানের বাইরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
উদ্দেশ্য: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক শক্তি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ‘অস্ত্র তৈরির’ সন্দেহ দূর করা।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ নিশ্চিত করেছেন যে, ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। মস্কো উত্তেজনা কমাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত।
সংবেদনশীল এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী শুক্রবার তুরস্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারী: মিশর, কাতার, তুরস্ক ও ওমান এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অ্যাক্সিওসের রিপোর্ট: মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস দাবি করেছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ইস্তাম্বুলে মুখোমুখি হতে পারেন। যদি এই বৈঠক সফল হয়, তবে তা হবে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বরফ গলানোর প্রক্রিয়া।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইরানের ওপর কোনো ধরণের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তা কেবল ইরান নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
তবে তেহরান একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—আলোচনা হবে কেবল পারমাণবিক ইস্যুতে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর (যেমন: হিজবুল্লাহ বা হামাস) প্রতি সমর্থন নিয়ে কোনো ধরণের দর কষাকষি করবে না ইরান।
মস্কোতে লারিজানির মাধ্যমে পাঠানো খামেনির এই ‘ব্যক্তিগত বার্তা’ মূলত ইরানকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থেকে বাঁচানোর কৌশল। একদিকে রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব গভীর করা, অন্যদিকে তুরস্কের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোপন আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা—এই দ্বিমুখী নীতিতে তেহরান কতটা সফল হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এএন