আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
লিবিয়ার আকাশে ধূমকেতুর মতো উদয় হওয়া এবং দীর্ঘ সময় অন্ধকারের আড়ালে থেকে পুনরায় ফিরে আসার স্বপ্ন দেখা সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফির জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির উত্তরসূরি সাইফের এ পরিণতি যতটা না বিস্ময়কর, তার চেয়েও বড় বিস্ময় ছিল ২০১১ সালের সেই রক্তাক্ত বিপ্লবের পর দেড় দশক ধরে তার বেঁচে থাকা। যে অভিযানে সাইফ নিহত হয়েছেন, তার খুঁটিনাটি এখনো রহস্যাবৃত।
তবে লিবিয়ার বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক মানচিত্রে তার এ প্রস্থান ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ব্রিটিশ ইরাকি বিশ্লেষক কারাম নামার দৃষ্টিতে, সাইফের মৃত্যু লিবিয়ার ট্র্যাজেডির এক নতুন অধ্যায় মাত্র, যেখানে ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে।
২০১১ সালে যখন মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে সির্তের রাস্তায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তখন তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের পরিণতি হয়েছিল অবর্ণনীয়। ভাই মুত্তাসিম বাবার সঙ্গেই প্রাণ হারান, বাকিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে সাইফ আল ইসলাম কেবল বেঁচে যাননি, বরং দীর্ঘ সময় জিনতানের একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হাতে বন্দী থেকেও তিনি রাজনৈতিক সমীকরণে নিজের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রেখেছিলেন। সাইফের এ টিকে থাকা কোনো ব্যক্তিগত বীরত্ব বা জনসমর্থনের ফসল ছিল না। বরং তিনি ছিলেন বিবাদমান পক্ষগুলোর কাছে একটি তুরুপের তাস।
দেশি বিদেশি নানা পক্ষ তাকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে, কখনো চাপ সৃষ্টির জন্য, কখনো বা দরকষাকষির মাধ্যম হিসেবে। লিবিয়ার বিশৃঙ্খল খেলায় যত বেশি তাস, তত সুবিধা। আর খেলার নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাসটিকে ছুড়ে ফেলাই স্বাভাবিক।
২০০০ এর দশকের শুরুতে সাইফ আল ইসলাম নিজেকে লিবিয়ার আধুনিক ও সংস্কারপন্থী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লকারবি বিমান হামলার ক্ষতিপূরণ মেটানো থেকে শুরু করে বুলগেরীয় নার্সদের মুক্তি, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন গাদ্দাফি শাসনের এক গ্রহণযোগ্য উত্তরাধিকারী। লন্ডন, প্যারিস ও রোমের অভিজাত মহলে তার বিচরণ ছিল ঈর্ষণীয়।
কিন্তু ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান যখন শুরু হলো, তখন সাইফের সেই লিবারেল বা উদারপন্থী মুখোশটি খসে পড়তে সময় লাগেনি। তিনি বাবার পথেই হাঁটলেন। বেনগাজির বিদ্রোহীদের আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার বদলে তিনি যুদ্ধের ভাষা বেছে নিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, তিনি কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারেননি যে তিনি তার বাবার চেয়ে আলাদা কিছু।
২০২১ সালে যখন দীর্ঘ অন্তরাল ভেঙে সাবহা থেকে সাইফ আল ইসলাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন, তখন সেটি ছিল এক করুণ আর্তি। ত্রিপোলিতে তার কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না, বেনগাজিও তার জন্য নিরাপদ ছিল না। অগত্যা তাকে বেছে নিতে হয়েছিল সেই মরুভূমি, যেখান থেকে তার বাবার উত্থান হয়েছিল।
লিবিয়ার মানুষ সাবহা বা এ মরু অঞ্চলকে নরকের রাস্তা বলে জানে। সাইফ চেয়েছিলেন এ শুষ্ক ভূখণ্ডকে তার ক্ষমতার মঞ্চ বানাতে। কিন্তু লিবিয়া তখন আর সেই আগের দেশ নেই। দেশটি তখন ছোট ছোট গোত্রীয় আনুগত্যে বিভক্ত। সাইফ জাতীয় নেতার বদলে কেবল একটি গোত্রীয় স্বার্থের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তার পরাজয় সেখানেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।
সাইফ আল ইসলামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লিবিয়ার একটি জটিল সমীকরণের সমাধান হলো কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাইফের প্রভাব ছিল কেবল দক্ষিণাঞ্চলীয় কিছু পকেটে। ত্রিপোলি বা মিসরাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। বিশ্ব সম্প্রদায় এমন কোনো নেতাকে গ্রহণ করতে চায়নি, যার গায়ে অতীতের রক্তের দাগ লেগে আছে। তাকে পুনর্বাসনের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
একসময় তাকে হত্যা করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কারণ তার অনুসারীদের প্রতিক্রিয়ার ভয় ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ভারসাম্য বদলে গেছে। তার মৃত্যু এখন আর কোনো বড় সংকটের চেয়ে বরং এক বাস্তব সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রোমান দার্শনিক এমিল সিওরান বলেছিলেন, যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, তাকে শাস্তি হিসেবে নিজের অতীত বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হয়। লিবিয়া আজ সেই পথেই হাঁটছে। গাদ্দাফির একনায়কত্ব যেমন সমাধান ছিল না, তেমনি ২০১১ পরবর্তী মিলিশিয়া ও রাষ্ট্র লুটেরারাও কোনো সমাধান দিতে পারেনি।
সাইফ আল ইসলামকে পছন্দ বা অপছন্দ করা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো তিনি তার বাবার করা ভুলগুলোই আবার করছিলেন। তিনি জাতির বদলে গোত্রের ওপর ভরসা করেছিলেন। লিবিয়াকে একটি একীভূত রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করার ক্ষমতা তার ছিল না।
ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি ১৯১১ সালে লিখেছিলেন, লিবিয়ার মাটি কাউকে ক্ষমতা দেয় না, কেবল নিয়ন্ত্রণের একটি ভ্রম দেয়। সাইফ আল ইসলাম সেই ভ্রমের পেছনে ছুটতে ছুটতে শেষ পর্যন্ত মরুভূমির বালিতেই মিশে গেলেন। তার মৃত্যুতে লিবিয়ার অনিশ্চয়তা কমবে না, বরং বেড়েছে।
কারণ, যখন একটি জাতি নির্বাচনের তারিখ নিয়ে একমত হতে পারে না, তখন একজন বিতর্কিত নেতার প্রস্থান সেই বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে। গাদ্দাফির ছেলের বেঁচে থাকা যেমন ছিল বিস্ময়কর, তার মৃত্যু তেমনি লিবিয়ার এক অন্তহীন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি।
ইএইচ