বিশেষ প্রতিবেদন
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
মিয়ানমারের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের শুরুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং জটিল এক মোড়বদল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক পর পরই দেশটিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জান্তা সরকারের অধীনে বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন।
বাংলাদেশে যখন নতুন সরকার গঠনের ডামাডোল চলছে, ঠিক সেই সময়েই সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারে নিঃশব্দে ঘটে গেল এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন। গত ২৫ জানুয়ারি তিন দফায় জাতীয় নির্বাচন শেষ করেছে জান্তা সরকার বা 'তাতমা-দ'। ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনের পাঁচ বছর পূর্তির লগ্নে এই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের 'বেসামরিক আবরণ' দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের আড়ালে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার যে নতুন ছক তৈরি হচ্ছে, তা বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জান্তা অনুমোদিত মাত্র ছয়টি দল। অং সান সু চির দল এনএলডি-সহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর নিবন্ধন আগেই বাতিল করা হয়েছে। ফলে সামনের মাসে যে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তা মূলত সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জোট 'ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি' বা ইউএসডিপি-র নেতৃত্বাধীন হবে।
মিয়ানমারের প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা হলো, বেসামরিক সরকার এলেও প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্ত মন্ত্রণালয়ের চাবিকাঠি থাকবে সেনাবাহিনীর হাতেই। পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসনও তাদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে এই পরিবর্তন কেবল নামেমাত্র; ক্ষমতার প্রকৃত লাগাম আগের মতোই জেনারেলদের মুঠোয় বন্দি থাকছে।
মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের ধারায় সবচাইতে বড় চমক হিসেবে এসেছে গত ১৫ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করা ১৯টি গেরিলা সংগঠনের নতুন জোট স্প্রিং রেভোল্যুশন অ্যালায়েন্স বা এসআরএ।
বিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের কৌশলগত সংকট কাটাতে এই জোট গঠন করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য একটি 'ফেডারেল সেনাবাহিনী' গড়ে তোলা।
৪২ বছর বয়সী কারেননি নেতা খুন বেদু-র নেতৃত্বে এই তরুণ প্রজন্ম সু চির মতো পুরোনো বামার নেতৃত্বের বাইরে বহু জাতিসত্তার যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
কেবল যুদ্ধ নয়, এই জোট তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মোবাইল ক্লিনিক ও স্কুলের মতো নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এসআরএ সামরিকভাবে চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে, যা মিয়ানমারের গেরিলা ইতিহাসে একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই তাতমা-দ নতুন করে গেরিলা দমনে বিশেষ অভিযানে নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে আরাকান আর্মি (AA)।
আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রাখাইন প্রদেশের বড় অংশ থাকলেও সিত্তিউই এবং শিল্পশহর চাইয়াকফুর মতো কৌশলগত জায়গাগুলো এখনো জান্তার দখলে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মংডু এলাকায় রোহিঙ্গা উপদলগুলো জান্তার ফেলে যাওয়া অস্ত্র পেয়ে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। এটি আরাকান আর্মির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যও এক নতুন ঝুঁকির কারণ।
সু চির সমর্থিত প্রবাসী সরকার বা এনইউজি এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও মাঠপর্যায়ে তাদের প্রভাব কমতে শুরু করেছে। পাঁচ বছরে জান্তার বিরুদ্ধে বড় কোনো সামরিক বিজয় না আসায় জনগণের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি ভর করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এবং ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখালে এনইউজি-র অস্তিত্ব আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই হয়তো 'এসআরএ'-র মতো জোটগুলো সামনে এগিয়ে আসছে।
মিয়ানমারের এই নির্বাচন কোনোভাবেই গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং জান্তার শাসনের এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। একদিকে জেনারেলদের নতুন ‘বেসামরিক’ সরকার এবং অন্যদিকে এসআরএ-র মতো নতুন গেরিলা জোটের উত্থান মিয়ানমারকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন সরকারকে এই পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং আরাকান সীমান্তের নতুন সংঘাত মোকাবিলায় দূরদর্শী কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
এএন