আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ১, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। শনিবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধের যে আগুন তেহরান জ্বালিয়েছে, তার লেলিহান শিখা এখন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে শুরু করে দুবাইয়ের পর্যটন কেন্দ্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার রিয়াদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দুবাই বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা এবং তেহরানের হৃদপিণ্ডে ইসরাইলের পুনরায় বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এক মহাপ্রলয়ংকারী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, রোববার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের পূর্ব অংশে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘরবাড়ির জানালা কেঁপে ওঠে এবং আকাশ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়।
যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান তার ‘প্রতিশোধমূলক অভিযানের’ অংশ হিসেবে রিয়াদকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশেষ করে বাহরাইন ও কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর সৌদি আরবে এই বিস্ফোরণ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিলাসবহুল জীবনযাপন আর বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাই এখন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে। ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার সকালে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এটি ছিল ইরানের দ্বিতীয় দিনের মতো চালানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলাফল।
শনিবার ইরানের ড্রোনগুলো দুবাইয়ের আইকনিক হোটেল বুর্জ আল আরব এবং কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেইরাহতে আঘাত হানে। বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আবাসস্থল এই নগরীতে এখন কেবল সাইরেনের শব্দ আর বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি।
এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত এই বিমানবন্দরটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে।
একদিকে ইরান যখন প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) দাবি করেছে তারা তেহরানের একেবারে ‘হৃদপিণ্ডে’ বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, রোববার তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভানাক স্কয়ার, মোতাহারি সড়ক এবং সাইয়্যেদ খানদান এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ইসরাইলের দাবি, তারা ইরানের অবশিষ্ট সামরিক কমান্ড সেন্টার এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলো ধ্বংস করার লক্ষ্যেই এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ পরিচালনা করছে। তেহরানের আকাশজুড়ে এখন কেবল যুদ্ধবিমানের গর্জন আর অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানের শব্দ।
শনিবার মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তার পরিবারের চার সদস্য এবং অন্তত দুইজন শীর্ষ সামরিক নেতার মৃত্যুর পর ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব ‘ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র আক্রমণাত্মক অভিযান’ চালানোর শপথ নিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ও ইসরাইলি অস্তিত্ব মুছে যাচ্ছে, ততক্ষণ এই হামলা থামবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ কেবল ইরান বা ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো যারা এতদিন সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়াতে চায়নি, তারাও এখন ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া এই অভিযান কি শেষ পর্যন্ত তেহরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দেবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে রোববারের এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শান্তি এখন এক সুদূরপরাহত কল্পনা।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আজ শান্তির কপোত নয়, বরং উড়ছে মারণঘাতী ড্রোন। সাধারণ মানুষের রক্ত আর লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতারা ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছেন। দুবাইয়ের আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে তেহরানের প্রাচীন গলি—সবই আজ ধ্বংসের মুখে।
এএন