আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ১৪, ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির বুকে জেগে থাকা মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটারের এক ক্ষুদ্র ভূখণ্ড এখন বিশ্বের সংবাদপত্রের শিরোনাম। যে দ্বীপটিকে একসময় প্রখ্যাত ইরানি সাহিত্যিক জালাল আল এ আহমদ ‘নিঃসঙ্গ মুক্তা’ বলে অভিহিত করেছিলেন, আজ সেই খারগ দ্বীপ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বারুদের স্তূপ।
একপাশে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের স্তব্ধতা, আর অন্যপাশে আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের দানবীয় গর্জনে এই দ্বীপটি এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে বিভক্ত। ১৪ মার্চ ২০২৬ এর ভোরে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলার পর এই দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে খারগ দ্বীপের অবস্থান বুশেহর বন্দর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে। ইরানের জন্য এটি কোনো সাধারণ দ্বীপ নয়, এটি দেশটির অস্তিত্বের প্রতীক। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির অবিশ্বাস্য ৯০ শতাংশ এই একটি মাত্র দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়। বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এই ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপের বুক চিরে বিশ্ববাজারে যায়। দ্বীপটির চারপাশের পানির গভীরতা এতটাই বেশি যে, বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি জাহাজ বা সুপার ট্যাঙ্কারগুলো অনায়াসেই এখানে নোঙর করতে পারে। এটি একটি প্রাকৃতিক আশীর্বাদ, যা অন্য কোনো বন্দরে পাওয়া দুষ্কর।
ইরানের আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ তেলক্ষেত্র থেকে সমুদ্রতলের বিশাল পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এখানে আসে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে মূলত এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে, বিশেষ করে চীনে পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরান এই দ্বীপের ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করেছে, যা বর্তমানে দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রাখে।
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এই দ্বীপটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের বা আইআরজিসি এর কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি নিষিদ্ধ এলাকা। কিন্তু আজ শনিবার সেই নিরাপত্তা দেয়াল ভেদ করে মার্কিন বোমা আছড়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, হামলাটি মূলত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ভদ্রতার খাতিরে তেলের অবকাঠামো সরাসরি ধ্বংস করা হয়নি। তবে এই ভদ্রতা আসলে একটি কৌশলগত হুমকি। ইরান যদি হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে এই দ্বীপের অর্থনৈতিক কাঠামোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন তিনি। মূলত খারগ দ্বীপকে জিম্মি করে ইরানকে কূটনৈতিক টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।
তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই খারগ দ্বীপ ছিল দিগ্বিজয়ীদের চোখের মণি। প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুযায়ী, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সময় থেকেই এই দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব ছিল। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ওলন্দাজ বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে শক্তিশালী দুর্গ তৈরি করে বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে ১৭৬৬ সালে স্থানীয় বীর মির মুহান্না ডাচদের পরাজিত করে দ্বীপটি পুনরুদ্ধার করেন।
রেজা শাহ পাহলভির আমলে এটি রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে দ্বীপটির আধুনিক রূপান্তর শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৬০ সালে প্রথম বড় তেলের চালান এই দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি বিপ্লবের সূচনা ঘটে।
আধুনিক তেলের ট্যাংকের বিশাল ছায়ার নিচে চাপা পড়ে আছে এই দ্বীপের বিচিত্র ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অতীত। এখানকার প্রাচীন কবরস্থানগুলোতে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে জরথুস্ত্রবাদ, খ্রিষ্টান এবং সাসানিদ আমলের সমাধিগুলো একে অপরের পাশে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছে। সপ্তম হিজরি শতকের মির মোহাম্মদ মাজার বা প্রাগৈতিহাসিক আমলের মির আরাম মাজার আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এখানে পাওয়া একটি প্রাচীন একিমেনিড শিলালিপি, যেখানে পারস্য উপসাগর নামটি স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে। এই শিলালিপিটি ইরানিদের জাতীয় আবেগের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮০ এর দশকে ইরান ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী এই দ্বীপটি প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল, কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে আবারও জেগে উঠেছিল এই নিঃসঙ্গ মুক্তা।
বর্তমানে খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার পর তেলের বাজার চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি পূর্ণমাত্রায় এই দ্বীপের তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে। চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়বে। ইরান ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোতে যেকোনো আগ্রাসন মানেই আঞ্চলিক যুদ্ধের দামামা।
অন্যদিকে, মার্কিন মেরিন সেনার আগমন এবং ইউএসএস ত্রিপোলির উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপটিই হতে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণকারী কেন্দ্র। প্রাচীন ইতিহাসের গাম্ভীর্য আর আধুনিক তেলের ড্রামের গুমগুম শব্দে খারগ দ্বীপ এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে। পারস্য উপসাগরের এই নিঃসঙ্গ মুক্তা কি আবারও ধ্বংসের মুখে পড়বে, নাকি ইতিহাসের ধুলোবালি মেখে টিকে থাকবে, তা বলে দেবে সামনের কয়েক দিন। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা।
জেএইচআর