আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
ইরানি প্রতিনিধি দল যখন শান্তি আলোচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে পৌঁছায়, তখন তারা একটি সাধারণ বাণিজ্যিক বিমানে নয়, বরং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ফ্লাইটে ভ্রমণ করেছে। ইরান সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, এই বিশেষ ফ্লাইটটির নাম দেওয়া হয়েছে মিনাব ১৬৮।
এই নামটির পেছনে রয়েছে যুদ্ধের প্রথম দিনের এক মর্মান্তিক স্মৃতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের মিনাব শহরে অবস্থিত শাজারেহ তাইয়েবাহ গার্লস এলিমেন্টারি স্কুলে একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় মোট ১৬৮ জন নিহত হন।
নিহতদের অধিকাংশই ছিল ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী এবং স্কুলটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিধ্বংসী হামলার শিকার শিশুদের সম্মান জানাতে এবং তাদের আত্মত্যাগকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতেই প্রতিনিধি দলের বিমানটির নামকরণ করা হয়েছে মিনাব ১৬৮।
মিনাবের এই হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকান সামরিক তদন্তকারীরা বিশ্বাস করছেন যে মার্কিন বাহিনী সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে এই স্কুলে আঘাত হেনেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এর আগে জানিয়েছিলেন যে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এটিকে যুদ্ধের নৃশংসতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে এবং শান্তি আলোচনার টেবিলে বসার আগে তারা এই স্মৃতিকে সাথে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানে অবতরণের পর ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি ছবি পোস্ট করেন যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ছবিতে দেখা যায় বিমানের ভেতর চারটি আসন খালি রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি আসনে একটি করে নিহত শিশুর ছবি রাখা আছে।
ছবির ঠিক নিচে রাখা হয়েছে শিশুদের স্কুল ব্যাগ এবং একগুচ্ছ ফুল। এই ছবির মাধ্যমে ঘালিবাফ এবং ইরান সরকার বিশ্বকে একটি কড়া বার্তা দিতে চেয়েছেন। তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই শান্তি আলোচনা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি সেই সব নিরপরাধ শিশুদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত যন্ত্রণার ফসল।
শান্তি আলোচনার শুরুতে এই ধরণের প্রতীকী পদক্ষেপ সাধারণত প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে ব্যবহৃত হয়। ইরান এখানে ভুক্তভোগী হিসেবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে।
তেহরান একদিকে শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রথম দিনে হওয়া এই ভুল হামলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি তুলছে। ঘালিবাফের পোস্ট করা ছবিটি মূলত ইরানের সাধারণ মানুষের আবেগ এবং ক্ষোভের প্রতিফলন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধের ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
মিনাব ১৬৮ কেবল একটি ফ্লাইটের নম্বর নয়, এটি বর্তমানে ইরানের শোক ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ১৬৮ জন প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্মৃতি নিয়ে যখন প্রতিনিধি দল আলোচনায় বসছে, তখন এটি স্পষ্ট যে ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হবে এই ধরণের নৃশংসতার অবসান এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। শান্তি আলোচনার পিচ্ছিল পথে এই আবেগঘন শুরুটি শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আনে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তথ্যসুত্র: বিবিসি
জেএইচআর