আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০১:০২ পিএম
২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের আকস্মিক অভিঘাতে বৈশ্বিক তেলের বাজার আমূল বদলে গেছে। যেখানে বছরের শুরুতে উদ্বৃত্ত তেলের প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এখন বাজার বড় ধরনের ঘাটতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
মাত্র কয়েক মাস আগেও বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন যে, ২০২৬ সাল হবে তেলের বাজারে স্বস্তির বছর। ওপেকের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও গায়ানার ক্রমবর্ধমান উৎপাদনের ফলে বাজারে দৈনিক ১৬.৩ লাখ ব্যারেল উদ্বৃত্ত তেল থাকার কথা ছিল।
কিন্তু রয়টার্সের সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমানে আটজন শীর্ষ বিশ্লেষক পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, এ বছর বিশ্ববাজারে প্রতিদিন গড়ে ‘৭.৫ লাখ ব্যারেল‘তেলের ঘাটতি দেখা দেবে। যুদ্ধের ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এমনভাবে ভেঙে পড়েছে যে, চাহিদার তুলনায় যোগান অনেক কমে গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী‘কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথটি দিয়ে প্রবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) মতে, মার্চ মাসের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। ম্যাককোয়ারি গ্রুপের কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদীর মতে, যুদ্ধের কারণে বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
এ বছর এপ্রিল থেকে জুন মাস হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। এই সময়ে দৈনিক প্রায় ‘৩০ লাখ ব্যারেল‘তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবে বছরের শেষ নাগাদ দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল উদ্বৃত্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির ওপর।
অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড ব্যাংকিং গ্রুপ (ANZ) এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে, যুদ্ধের ফলে ইরানের অনেক তেলক্ষেত্র এবং অবকাঠামো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ‘২০ লাখ ব্যারেল‘তেল উৎপাদন ক্ষমতা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তেলের খনিগুলো একবার বন্ধ হয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো পুনরায় চালু করা দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের পূর্বাভাস এক লাফে ৩০% বাড়িয়ে ব্যারেল প্রতি গড়ে ‘৮২.৮৫ ডলার‘করা হয়েছে। যদিও যুদ্ধের উত্তেজনায় অনেক সময় এটি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও শিপিং কোম্পানিগুলো এখনই জাহাজ পাঠাতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ বিমা খরচ আকাশচুম্বী এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে লেনদেনে আইনি জটিলতা রয়ে গেছে।
সম্প্রতি একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে সংশয় কাটছে না। ইরান এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর 'ট্রানজিট ফি' বা টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করবে। ব্যবসায়ীদের ভয়, এই টোল পরিশোধ করলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে, যা সরবরাহ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
২০২৬ সালের এই 'অয়েল হুইপল্যাশ' প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে ওলটপালট করে দিতে পারে। তেলের বাজার ঘাটতিতে পড়ার অর্থ হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং পরোক্ষভাবে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। উৎপাদন পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কেবল কয়েক মাসের ব্যাপার নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ। বিশ্ব এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক হওয়ার দিকে।
সূত্র: রয়টার্স
এএন