আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
বিশ্ব তেলের বাজারে নতুন করে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ আটক করেছে। এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম এক লাফে ৬% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৯৬ ডলারে (প্রায় ৭১ পাউন্ড) পৌঁছেছে।
গত শুক্রবার ইরান ঘোষণা করেছিল যে, যুদ্ধবিরতির বাকি দিনগুলোতে 'হরমুজ প্রণালী' বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেই খবরের পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও, শনিবার ইরানের অবস্থান পরিবর্তন এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বাজারকে পুনরায় অস্থির করে তুলেছে। ইরান এখন বলছে, তারা প্রণালীটি পুনরায় বন্ধ করে দিচ্ছে এবং এর কাছাকাছি আসা যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০% এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়।
বর্তমানে যে ফিউচার কন্টাক্ট বা অগ্রিম চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেগুলো মূলত আগামী জুন মাসে তেল সরবরাহের জন্য। কিন্তু পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।
কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও আলোচনার টেবিল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের জন্য সোমবার পাকিস্তানে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আপাতত এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ জারি রেখে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সাফ কথা, যতক্ষণ না একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো যাচ্ছে, ততক্ষণ এই নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে।
এমএসটি মারকুই-এর বিশ্লেষক সল কাভোনিক বিবিসি-কে বলেছেন, তেলের বাজার এখন মাঠের বাস্তবের চেয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টের ওপর ভিত্তি করে বেশি ওঠানামা করছে। এটি আসলে হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি চলা একটি দর কষাকষির লড়াই।
এশিয়ায় জ্বালানি সংকট ও জনজীবনে বিপর্যয়
এই উত্তেজনার ফলে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশীয় অঞ্চল। এশিয়ার দেশগুলো তাদের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০% মেটাতে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সংকটের কারণে এই দেশগুলোতে জ্বালানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে।
অনেক দেশের সরকার কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার (Work from home) নির্দেশ দিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে অনেক দেশে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে নাগরিকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি ব্যবহার সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চীনের কাছে তিন মাসের আমদানির সমপরিমাণ মজুত থাকলেও তারা জ্বালানির দাম ২০% বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট এখন আকাশপথের যোগাযোগকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইউরোপের কাছে বড়জোর ‘ছয় সপ্তাহের‘জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানি মজুত আছে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে অচিরেই হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে হতে পারে। এশিয়াজুড়ে বিমান সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্যের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ শুরু করেছে।
যুক্তরাজ্যে গত সপ্তাহের শেষের দিকে পেট্রোল ও ডিজেলের দামে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুনরায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
শেয়ার বাজারের প্রতিক্রিয়া
সোমবার বিশ্ব শেয়ার বাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। ইউরোপের প্রধান বাজারগুলো যেমন লন্ডনের FTSE 100, জার্মানির Dax এবং ফ্রান্সের Cac 40 সূচক ১% এর বেশি কমেছে। তবে এশিয়ার বাজারগুলোতে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে; জাপানের নিক্কেই সূচক ০.৬% এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ০.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বাজার এখন আর কথার ওপর বিশ্বাস করছে না, বরং তারা প্রকৃত পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।‘৭ ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কো-চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার শান্তি কেলেমেন বলেন, বাজারের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি চলে এসেছে কারণ পরিস্থিতি বারবার পরিবর্তন হচ্ছে।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না তাদের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালী খুলবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্ব যে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে, তা ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে আরও ভয়াবহ রূপ নিলো। হরমুজ প্রণালী যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, তবে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে। পাকিস্তানের আসন্ন আলোচনাটি তাই এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এএন