আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইসলামাবাদ। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি কার্যকর মধ্যস্থতার লক্ষে পাকিস্তানের মাটিতে শুরু হয়েছে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা। হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার আজ শনিবার পাকিস্তানে পৌঁছাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতিমধ্যেই সশরীরে ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। দিনটি এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো বা নতুন কোনো চুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির ৫৭ তম দিনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অভিজ্ঞ জ্যারেড কুশনারের এই মিশনে অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন পর্দার আড়ালে বড় কোনো সমঝোতার পথ খুঁজছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, পাকিস্তান এখানে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির ইসলামাবাদে আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, কিন্তু মার্কিন প্রতিনিধিদের একই সময়ে উপস্থিতি বিষয়টিকে ত্রিদেশীয় বা পরোক্ষ আলোচনার দিকে মোড় নিতে বাধ্য করেছে।
পাকিস্তান দীর্ঘকাল ধরে ইরান ও সৌদি আরব, এমনকি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ইসলামাবাদের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে তাদের অর্থনৈতিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে প্রতিবেশী ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ ইরান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান ইতিমধ্যেই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আফগানিস্তান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় ইরানকে আরও নমনীয় করার জন্য মার্কিন বার্তা আরাগচির কাছে পৌঁছে দেবে পাকিস্তান।
এই সফরের কার্যসূচিতে কয়েকটি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে ইরানের ভূমিকা। এ ছাড়া ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোনো শিথিলতা আনা সম্ভব কি না সেই অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে।
পাকিস্তান ও ইরানের সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ইরান পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে মার্কিন অবস্থানের পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই সফরের এজেন্ডায় রয়েছে।
জ্যারেড কুশনার এর আগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার এবারের মিশনও হয়তো তেমনই কোনো বড় ডিল বা চুক্তির অংশ। স্টিভ উইটকফ, যিনি ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে পরিচিত, তিনি মূলত কৌশলগত ও ব্যবসায়িক কূটনীতির দিকটি দেখছেন। তাদের এই সফর নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চাইছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করবে না। তবে তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে তেহরান যে কোনো গঠনমূলক আলোচনার জন্য প্রস্তুত। মার্কিন প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তার এই অবস্থান অত্যন্ত কৌশলী। তিনি সম্ভবত পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে একটি নির্দিষ্ট রেড লাইন বা সীমারেখা বুঝিয়ে দিতে চাইছেন।
বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইসলামাবাদের এই ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক তৎপরতাকে কীভাবে গ্রহণ করে, তা দেখার বিষয়। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আশা করছে যে, কুশনার ও উইটকফ জুটির এই সফর অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত করবে।
আজকের এই বৈঠকগুলো যদি সফল হয়, তবে তা ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। পাকিস্তান যদি সফলভাবে এই দুই চরম বৈরী পক্ষকে একটি সাধারণ বিন্দুতে আনতে পারে, তবে তা হবে ইসলামাবাদের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয়।
ইসলামাবাদের আকাশ এখন কূটনৈতিক গুঞ্জনে মুখর। স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের অবতরণের মধ্য দিয়ে আলোচনার টেবিল পূর্ণতা পাবে। দিনের শেষে কী ফলাফল আসে, তার ওপর নির্ভর করছে কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আগামী কয়েক মাসের স্থিতিশীলতা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মার্কিন দূতদের এই একই সময়ে উপস্থিতি কি নিছক কাকতালীয় নাকি কোনো পরিকল্পিত সন্ধি, তার উত্তর মিলবে আজ বিকেলের যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা সরকারি বিবৃতিতে। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা।
জেএইচআর