আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ৩, ২০২৬, ০৭:১৩ এএম
একটি রক্তক্ষয়ী এবং অনিশ্চিত যুদ্ধের দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে ইরানের সাথে এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের ফলে ইরানকে দমানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য আগের চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই অমীমাংসিত যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের (গ্যাসোলিন) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে।
ভোটের সমীকরণ: ২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক মন্দা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জনমত জরিপ: রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তার মেয়াদের সর্বনিম্ন।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের যে লক্ষ্যগুলো ছিল, তার অধিকাংশই এখনো অর্জিত হয়নি। যদিও মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু মূল উদ্দেশ্যগুলো অধরাই থেকে গেছে:
ক্ষমতা পরিবর্তন: ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করার যে ডাক ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা সফল হয়নি।
পরমাণু অস্ত্র রোধ: গত জুনের হামলার পরও ইরানের ভূগর্ভে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রক্সি গ্রুপ: হিজবুল্লাহ, হুথি বা হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা সমর্থন বন্ধ করার লক্ষ্যটিও পূরণ হয়নি।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে 'হরমুজ প্রণালী' ঘিরে। ইরান এই কৌশলগত নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ২০ শতাংশ কমে গেছে।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ডের মতে, ট্রাম্প যদি এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে না পারেন, তবে ইতিহাসে তিনি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত হবেন যিনি বিশ্বকে আরও অনিরাপদ করে তুলেছেন।
বিশ্লেষক জন অল্টারম্যানের মতে, ইরান এখন বুঝতে পেরেছে যে তারা দুর্বল অবস্থায় থাকলেও যখন খুশি এই প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে। এটি যুদ্ধের আগে তাদের যতটা ক্ষমতা ছিল, তার চেয়েও বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ইরান সম্প্রতি একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠালেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানের দাবি ছিল, আগে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হোক, আর পরমাণু ইস্যুটি পরে দেখা যাবে। কিন্তু ট্রাম্প শুরুতেই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের শর্তে অনড়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেছেন যে, ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে 'মরিয়া'হয়ে উঠেছে এবং ট্রাম্পের হাতেই এখন সব নিয়ন্ত্রণ। তবে বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এটি একটি ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’ বা হিমায়িত যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকবে।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। ন্যাটো অংশীদাররা ট্রাম্পের এই একক যুদ্ধ ঘোষণার বিষয়ে আগে থেকে অবহিত ছিলেন না। অন্যদিকে, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর ক্ষমতা এখন আরও কট্টরপন্থী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) হাতে চলে গেছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘমেয়াদী নৌ-অবরোধের কথা ভাবছেন যাতে ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে তাদের আলোচনায় বাধ্য করা যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি একটি 'একতরফা বিজয়' ঘোষণা করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা প্রত্যাহারের পথও খুঁজছেন।
তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি কোনো শক্ত চুক্তি ছাড়াই পিছু হটেন, তবে তেহরান একে তাদের কৌশলগত বিজয় হিসেবে প্রচার করবে। ইরানের পক্ষ থেকে সিনা তুসি নামের এক গবেষক জানান, ইরান বর্তমানে সময়ক্ষেপণের নীতি গ্রহণ করেছে। তারা দেখছে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কত দ্রুত হ্রাস পায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইরানের এই যুদ্ধ এখন একটি দ্বিমুখী তলোয়ারে পরিণত হয়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও ইরানকে পুরোপুরি নত করতে না পারা এবং দেশের ভেতরে তেলের উচ্চমূল্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পকে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি দ্রুত কোনো অর্থবহ চুক্তি না হয়, তবে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এএন