ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

বেইজিং-মস্কো অক্ষের দৃশ্যমান উষ্ণতা ও স্বার্থের অদৃশ্য ফাটল: পুতিন-শি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মে ২১, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

বেইজিং-মস্কো অক্ষের দৃশ্যমান উষ্ণতা ও স্বার্থের অদৃশ্য ফাটল: পুতিন-শি

সদ্যসমাপ্ত বেইজিং শীর্ষ সম্মেলন বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। লালগালিচা সংবর্ধনা, রুশ সুরের মূর্ছনা আর দুই রাষ্ট্রপ্রধানের পারস্পরিক প্রশংসাসূচক সম্বোধনের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর দুই দিনের চীন সফর শেষ করেছেন।

বাহ্যিকভাবে এই সফরকে ওয়াশিংটন তথা পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে বেইজিং-মস্কোর এক অভেদ্য ফ্রন্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দরকষাকষি। বিশেষ করে রাশিয়ার প্রস্তাবিত নতুন গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে বেইজিংয়ের ধীরগতির নীতি এটিই প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা।

গত মঙ্গলবার রাতে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং পৌঁছান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি ছিল বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার মতো এক আয়োজন। পুতিন যখন সি চিন পিংয়ের সঙ্গে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রবেশ করছিলেন, তখন চীনের সামরিক ব্যান্ড দল বাজাচ্ছিল বিখ্যাত রোমান্টিক রুশ ক্লাসিক গান ‘মস্কো নাইট’। এই সুরের আবহ কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল পশ্চিমাদের প্রতি বেইজিংয়ের একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা।

বৈঠকে দুই নেতার সম্বোধনও ছিল অত্যন্ত উষ্ণ। পুতিন সি-কে ‘আমার প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন, যার জবাবে চীনের প্রেসিডেন্টও তাঁকে ‘আমার পুরোনো বন্ধু’ বলে আপন করে নেন। উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত এই দুই ক্ষমতাধর নেতা ৪০ বারেরও বেশি মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এবারের বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অংশীদারত্ব, বন্ধুত্ব ও গভীর আস্থার ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ও সামরিক নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। বেইজিং ও মস্কো ওয়াশিংতনের বর্তমান পারমাণবিক নীতিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও যৌথভাবে সুর চড়ায় তারা। চীন ও রাশিয়ার মতে, এই ধরণের একতরফা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করবে।

সফরের আগে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি প্রতীকী কোলাজও ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে একদিকে দেখা যায়, গত সপ্তাহে চীন সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত একাকীভাবে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। ঠিক তার পাশেই জুড়ে দেওয়া হয় সি ও পুতিনের একসঙ্গে হাঁটার একটি পুরোনো ছবি। এই ছবির মাধ্যমে মস্কো বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছে যে আমেরিকা আজ বিশ্বমঞ্চে একাকী ও বিচ্ছিন্ন, পক্ষান্তরে রাশিয়া ও চীন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

প্রচারণায় দুই দেশের সম্পর্ককে যতটাই নিটোল দেখানো হোক না কেন, বাস্তব ভূ-রাজনীতি কেবল সুন্দর ছবি বা উষ্ণ বার্তার ওপর ভিত্তি করে চলে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর মূল চালিকাশক্তি হলো রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। আর ঠিক এই জায়গাতেই পুতিনের বেইজিং সফরের আসল পরীক্ষা ছিল।

ইউক্রেন অভিযানের পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে মস্কো তাদের ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় বাজার হারিয়ে তীব্র অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। এই বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্রেমলিনের এখন একমাত্র ভরসা এশিয়ার বাজার, বিশেষ করে চীন। আর এই লক্ষ্য অর্জনে পুতিনের এবারের সফরের মূল এজেন্ডা ছিল ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ নামক একটি মেগা পাইপলাইন প্রকল্প।

‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ রাশিয়ার লাইফলাইন:

  • পরিকল্পনা: এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম সাইবেরিয়ার বিপুল গ্যাস ভাণ্ডার মঙ্গোলিয়ার ওপর দিয়ে সরাসরি উত্তর চীনে সরবরাহ করা হবে।
  • রাশিয়ার লক্ষ্য: ইউরোপের বাজার হারানোর আর্থিক ক্ষতি এশিয়ার বাজারে বাড়তি গ্যাস বিক্রি করে দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া।
  • বর্তমান স্থিতি: গত বছর দুই দেশ এই প্রকল্পের একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেও চূড়ান্ত চুক্তি এখনো ঝুলে আছে।

বুধবার ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাশিয়া ও চীন এই প্রকল্পটির ‘মূল কাঠামো ও শর্তাবলি’ নিয়ে একটি ‘সাধারণ সমঝোতায়’ পৌঁছাতে পেরেছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এখনো কোনো চূড়ান্ত এবং বাধ্যতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। সফর শেষে বুধবারই পুতিন বেইজিং ত্যাগ করেন, কিন্তু বহুল প্রত্যাশিত এই চুক্তির চূড়ান্ত সিলমোহর ছাড়াই তাঁকে ফিরতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এই চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চাচ্ছে না। এর পেছনে দুটি মূল কারণ রয়েছে:

১. মূল্যহ্রাস বা ছাড়ের দাবি: চীন ভালো করেই জানে রাশিয়া এখন আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা এবং তাদের এই গ্যাস বিক্রি করা জরুরি। এই সুযোগে বেইজিং গ্যাসের দামের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের ছাড় বা সুবিধা আদায় করতে চায়।

২. অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়ানো: চীন কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নিজেদের অর্থনীতিকে অতিরিক্ত নির্ভরশীল করতে রাজি নয়। শক্তির উৎস বহুমুখী রাখাই বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী নীতি।

স্বয়ং রাশিয়ার সরকারি পত্রিকাই এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে লিখেছে, ‘রাশিয়া ও চীনের অবস্থান এক নয়। তাদের স্বার্থও সব সময় একে অপরের সঙ্গে মিলে যায় না।’

ভ্লাদিমির পুতিনের ২০ মে, ২০২৬-এর এই চীন সফর প্রমাণ করে যে, আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরোধিতার প্রশ্নে চীন ও রাশিয়া এক সুতোয় গাঁথা হলেও, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং সম্পূর্ণ ব্যবসায়ীসুলভ আচরণ করছে। দৃশ্যত তারা রাশিয়ার ‘প্রিয় বন্ধু’ হলেও, পর্দার আড়ালে নিজের দেশের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবটাই তাদের কাছে প্রধান।

পরিশেষে বলা যায়, বেইজিং-মস্কোর এই অক্ষ মূলত একটি ‘কৌশলগত সুবিধা ও স্বার্থের জোট’। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল করে তুলেছে, যা এই সম্পর্কে বেইজিংকে একধাপ সুবিধাজনক বা ‘সিনিয়র পার্টনার’-এর আসনে বসিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার ছবি যতই প্রকাশ করা হোক না কেন, ভেতরের অর্থনৈতিক স্বার্থের অমিলগুলো আগামী দিনে এই দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর

Link copied!