আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ২৯, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন শত বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদটিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় উপাসনালয়টি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি জানাজানি হতেই জনমনে ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্য রক্ষার পক্ষে-বিপক্ষে জোর চর্চা চলছে।
প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলাশাসকের কার্যালয়ে সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সংবেদনশীল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলেরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই বিতর্কিত মসজিদ এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।
মূলত বিমান ওঠানামার সময় রানওয়ের অতি নিকটে সাধারণ মানুষের ভিড় ও যাতায়াত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। নিরাপত্তা কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রানওয়ের এত কাছাকাছি একটি ধর্মীয় স্থাপনা থাকা আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্থাপনাটি দ্রুত স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই মসজিদটি স্থানান্তরের বিষয়টি একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু স্থানীয় জনগণের ধর্মীয় আবেগ এবং রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণে অতীতে কোনো সরকারই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস দেখায়নি। তবে বর্তমান প্রশাসন বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের স্বার্থে এবার সর্বসম্মতিক্রমে একটি সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে।
এদিকে প্রশাসনের এমন তোড়জোড়ে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, এই মসজিদটি কেবল একটি উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে প্রতি বছর ঈদের সময় এখানে বিশাল পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।
মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, তারা বিমানবন্দরের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করার বিরোধী নন। তবে এক শতাব্দীর পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙে ফেলা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় তারা তাড়াহুড়ো করতে চান না। যদিও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিকল্প স্থানে এর চেয়েও বড় মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, ১৯২৪ সালে দমদম বিমানবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার আগেই এই গৌরীপুর জামে মসজিদের অস্তিত্ব ছিল। পরবর্তীতে বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য আশপাশের বহু জমি অধিগ্রহণ করা হলেও এই মসজিদটি অক্ষত রাখা হয়েছিল। এমনকি এর কারণে একসময় ঐতিহাসিক যশোর রোডের নকশাও পরিবর্তন করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংবেদনশীল বিষয়টি শেষ পর্যন্ত রাজ্যে নতুন করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তবে প্রশাসনের দাবি, তারা কোনো পক্ষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছেন। এখন দেখার বিষয়, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।
এএন