আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১৮, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
দীর্ঘদিনের চরম উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে, ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা।
সংশ্লিষ্ট মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বুধবার দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এই নথিতে ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন করেন। এর আগে গত রোববার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের ক্যালিবাফ প্রাথমিকভাবে এই সমঝোতা স্মারকে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করেছিলেন। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হলেও, ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির পটভূমি, প্রধান শর্তাবলি, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর একটি বিস্তারিত রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে চুক্তির মূল শর্তাবলি ও বৈশ্বিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সমঝোতা স্মারকে প্রধানত চারটির বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বের ভূরাজনীতি এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চলেছে।
বিগত কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বাধার অবসান ঘটিয়ে হরমুজ প্রণালীকে পুরোপুরি সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক, পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এটি উন্মুক্ত হওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি। চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত বেশ কিছু কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় বৈধভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি শুরু করতে পারবে। এটি ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে। এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত একটি প্রাথমিক চুক্তি হওয়ায় আগামী ষাট দিনের মধ্যে দুই দেশ একটি স্থায়ী, ব্যাপক এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে যায়। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে দুই দেশ বারবার মুখোমুখি অবস্থানে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই বৈরিতা সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, যার ফলে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
এই অচলাবস্থা নিরসনে নেপথ্যে বেশ কিছু দিন ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল। ওমান, সুইজারল্যান্ড বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সহায়তায় গোপনে আলোচনার পর এই সপ্তাহের শুরুতে একটি চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হয়। গত রোববার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের শীর্ষ আলোচক তথা সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্যালিবাফের ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে চুক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। অবশেষে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত রূপ পায়।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব হিসেবে এই চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক বাজারে আসার সাথে সাথেই ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছিল এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। প্রণালীটি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া এবং ইরানের তেল বাজারে ফেরার ঘোষণায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে। এটি বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সাথে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন নিশ্চিন্তে এই রুটে জাহাজ চলাচল করতে পারবে। এর ফলে যুদ্ধকালীন উচ্চ বিমা প্রিমিয়াম কমে আসবে, যা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনের খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমিয়ে দেবে।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমেরিকা ও ইরানের এই আকস্মিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ রাতারাতি বদলে দিয়েছে। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননের মতো আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধগুলোতে ইরান ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। এই চুক্তির ফলে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আমেরিকার এই পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যে তার চিরাচরিত মিত্র, যেমন ইসরায়েল এবং কিছু উপসাগরীয় দেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ইসরায়েল বরাবরই ইরানের সাথে যেকোনো চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থে সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এই চুক্তিকে স্বাগত জানাতে পারে, কারণ রিয়াদ নিজেও তেহরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরান গত কয়েক বছরে রাশিয়া ও চীনের খুব কাছাকাছি এসেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান যদি পশ্চিমা অর্থনীতির সাথে পুনরায় যুক্ত হয়, তবে বেইজিং ও মস্কোর সাথে তেহরানের কৌশলগত সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়ে, তা দেখার বিষয়।
ডিজিটাল কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় হিসেবে এই চুক্তির আরেকটি অনন্য দিক হলো এর সম্পাদন প্রক্রিয়া। সাধারণত এই ধরনের ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী চুক্তি আন্তর্জাতিক কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যু, যেমন জেনেভা বা ভিয়েনা, জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সশরীরে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর করা হয়। প্রথমে সুইজারল্যান্ডে এমন একটি অনুষ্ঠানের কথা ভাবা হলেও, পরিস্থিতি এবং সময়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে দুই দেশই ডিজিটাল কূটনীতির আশ্রয় নেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের নিজ নিজ দেশ থেকে ডিজিটালভাবে এই নথিতে স্বাক্ষর করার ঘটনাটি প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আন্তর্জাতিক কূটনীতি কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে একটি নতুন উদাহরণ বা নজির হিসেবে কাজ করবে।
যদিও এই সমঝোতা স্মারকটি একটি বিশাল অগ্রগতি, তবে মনে রাখতে হবে এটি চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি মূলত একটি ষাট দিনের সাময়িক ফ্রেমওয়ার্ক বা রূপরেখা। এই দুই মাসের মধ্যে দুই দেশের কূটনীতিক ও কারিগরি দলগুলোকে অত্যন্ত জটিল কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। প্রথমত, ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কতটা কমিয়ে আনবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা কীভাবে তা পরিদর্শন করবে, তা নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, কোন কোন নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে এবং ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে তা কীভাবে পুনরায় চালু হবে, তার আইনি কাঠামো তৈরি করা। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে আলোচনা করা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই ডিজিটাল সমঝোতা স্মারকটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে দুই দেশ যেভাবে আলোচনার টেবিলে এসেছে, তা প্রশংসনীয়। তবে আগামী ষাট দিনের আলোচনা এবং স্থায়ী চুক্তি বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে এই শান্তির স্থায়িত্ব। যদি এই প্রক্রিয়া সফল হয়, তবে তা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। এই ঐতিহাসিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি আসবে বলে অনেকে মনে করছেন, নাকি আগামী ষাট দিনের আলোচনা বাস্তবায়নে বড় কোনো বাধা আসতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে।
জেএইচআর