ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

পরকীয়ায় ভাঙছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘর, হারাচ্ছেন সন্তান

হাশেম রেজা

হাশেম রেজা

অক্টোবর ১৯, ২০২৫, ০১:৪৫ পিএম

পরকীয়ায় ভাঙছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘর, হারাচ্ছেন সন্তান

বাংলাদেশের সমাজে আজ এক নীরব কান্না ছড়িয়ে আছে পরকীয়ার আগুনে পুড়ছে সংসার, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে সম্পর্ক, ধ্বংস হচ্ছে সন্তানের ভবিষ্যৎ। একদিন যে ঘরে হাসি-আনন্দে ভরে উঠত, আজ সেখানে নিস্তব্ধতা, অভিমান আর ঘৃণার বাতাস বইছে। বিশেষ করে যে পরিবারগুলোতে স্বামী বছরের পর বছর বিদেশে পরিশ্রম করে পাঠাচ্ছে রেমিট্যান্স সেই ঘরগুলোর অনেকগুলো আজ নিঃস্ব, শুধু অর্থে নয়, ভালোবাসায়ও।

প্রবাসে ঘাম, দেশে আগুন

প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা ইউরোপে যান পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। তারা ভোরে কাজ শুরু করেন, রাতের আঁধারেও কাজ শেষ হয় না। তাদের চোখে শুধু একটাই স্বপ্ন ঘরে থাকা স্ত্রী-সন্তান যেন ভালো থাকে। কিন্তু যত বছর পেরিয়ে যায়, সেই দূরত্বই হয়ে ওঠে অভিশাপ।

স্ত্রী প্রথমে স্বামীর অনুপস্থিতিকে সামলাতে শেখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শূন্যতায় ঢুকে পড়ে নতুন সম্পর্ক। কোথাও প্রতিবেশী, কোথাও আত্মীয়, আবার কোথাও বন্ধুত্বের সূত্রে শুরু হয় সেই নিষিদ্ধ টান। শুরুটা সহানুভূতি দিয়ে, শেষে তা হয়ে ওঠে পরকীয়া নামের আগুন যা এক মুহূর্তে পুড়িয়ে দেয় বছরের পর বছর গড়া সংসার।

পরকীয়ার আগুনে সন্তানের ভবিষ্যৎ

সবচেয়ে বেশি ভোগে সন্তানরা। তারা বুঝতে পারে না কেন মা অন্য এক “চাচার” সঙ্গে কথা বলে, কেন বাবা দেশে ফিরলে বাড়ির পরিবেশ অচেনা লাগে। ধীরে ধীরে তাদের ভেতর জন্ম নেয় এক ভয়াবহ মানসিক বিভাজন—বাবা-মায়ের প্রতি ঘৃণা, সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই ধরনের পারিবারিক ভাঙনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশু। তারা পরিণত বয়সে গিয়ে হয়ে ওঠে অবিশ্বাসী, হিংস্র বা মানসিকভাবে অস্থির।

এভাবে একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে যেখানে মায়ের ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী, বাবার উপস্থিতি শুধুই ফোনের ওপারে।

কেন হচ্ছে এমন?

এ প্রশ্ন আজ সবার। কেন এত সংসার ভাঙছে? কেন মায়ের কোলে সন্তান রেখে স্ত্রী অন্যের সঙ্গে চলে যাচ্ছে?

মূল কারণ তিনটি

একাকীত্ব ও মানসিক শূন্যতা: বিদেশে থাকা স্বামী বছরের পর বছর ফিরে আসে না। ফোনে কথা হলেও, ভালোবাসার ছোঁয়া থাকে না। এক সময় এই একাকীত্ব পূরণের প্রয়োজনে স্ত্রী খুঁজে নেয় নতুন সম্পর্ক।

সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক দুর্বলতা: পরকীয়ার সংস্কৃতি এখন ফেসবুক, নাটক, সিনেমা সবখানেই এক ধরনের রোমান্টিক রূপ পেয়েছে। অনেকে এখন আর এটিকে পাপ বলে মনে করে না, বরং স্বাধীনতা মনে করে।

আর্থিক স্বাচ্ছল্য কিন্তু আবেগিক শূন্যতা: রেমিটেন্সের টাকায় ঘরবাড়ি তৈরি হয়, কিন্তু সেই ঘরে ভালোবাসার উষ্ণতা থাকে না। টাকা যত বাড়ে, সম্পর্ক তত ঠান্ডা হয়ে যায়।

সমাজের নীরব দর্শকতা

সবাই জানে, আশপাশে কী হচ্ছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়রা সবার চোখে পড়ে সেই অস্বাভাবিক সম্পর্ক। কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। ওদের ব্যাপার ওরা সামলাক এই ভীরুতার সংস্কৃতি সমাজে পরকীয়াকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রামে এখন পরকীয়া যেন গোপন নয়, প্রকাশ্য বিষয় হয়ে উঠছে। ফেসবুকে লাইভ, রিল, মেসেঞ্জারে গোপন ভিডিও সব মিলে সমাজে নৈতিকতার মৃত্যু ঘটছে নিঃশব্দে।

ধর্ম ও নৈতিকতার দূরত্ব

ইসলামে পরকীয়া (ব্যভিচার) সবচেয়ে বড় গোনাহ। আল্লাহ বলেন, ব্যভিচারের কাছেও যেও না, এটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।(সূরা ইসরা, আয়াত ৩২)

কিন্তু আজ সেই সতর্কবার্তা যেন কারও কানে পৌঁছায় না। ধর্মের জায়গায় এসেছে ভোগবিলাস, ঈমানের জায়গায় এসেছে সামাজিক মর্যাদা আর আত্মতৃপ্তি। আর যে নারী একদিন নামাজে হাত তুলে প্রার্থনা করত হে আল্লাহ, আমার স্বামী যেন ভালো থাকে, আজ সেই হয়তো অন্যের বাহুডোরে সুখ খুঁজছে। এই দ্বিচারিতা সমাজকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রবাসী স্বামীদের ট্র্যাজেডি

মালয়েশিয়ার এক নির্মাণ শ্রমিক আবদুল মালেকের গল্পটা যেন হাজার প্রবাসীর কষ্টের প্রতিচ্ছবি। সাত বছর ধরে তিনি দেশে যাননি। টাকায় ঘর বানিয়েছেন, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেছেন। হঠাৎ একদিন ফোনে খবর পেলেন, স্ত্রী অন্য এক লোকের সঙ্গে চলে গেছে। তিনি আর দেশে ফেরেননি। আজও রিয়াদের শ্রমিক ক্যাম্পে বসে কান্না করেন একটাই কথা বলে, আমি টাকা পাঠাই, ভালোবাসা না কি পাঠাই নাই?

এমন শত শত কাহিনি আজ ভাসছে প্রবাসীদের হৃদয়ে। তারা দেশে ফিরে দেখছেন, যে ঘরের জন্য কষ্ট করেছিল, সেই ঘরেই অন্য কেউ এখন স্বামী।

সন্তানের মনোজগতে যে বিষ ছড়ায়

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, পরকীয়ায় ভাঙা সংসারের সন্তানদের মধ্যে দুই ধরনের মানসিক প্রবণতা দেখা যায়, ক্ষোভ ও ঘৃণা। তারা মনে করে, কেউ বিশ্বাসযোগ্য নয়। ফলাফল মাদক, অপরাধ বা আত্মবিধ্বংসী আচরণ।

অতি নির্ভরতা ও আত্মহীনতা: মা ও বাবার স্নেহ হারিয়ে তারা নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। ফলে জীবনের প্রতি অনাগ্রহ জন্মায়।

একজন শিশু যখন দেখে, তার মা অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে গেছে, তখন তার মনে শুধু একটা প্রশ্ন জাগে, ভালোবাসা কি মিথ্যা?

পরকীয়ার পেছনে প্রযুক্তির ছায়া

মোবাইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ এগুলো এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সম্পর্ক তৈরিরও মাধ্যম। একসময় চিঠিতে আসত ভালোবাসা, এখন ইনবক্সে আসে প্রলোভন।

বিবাহিত নারীরা সহজেই অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন, আবেগ ভাগ করেন, অভিযোগ করেন আর সেখান থেকেই শুরু হয় মানসিক সম্পর্ক, পরে শারীরিক। প্রযুক্তি যখন বিবেকহীন হাতে পড়ে, তখন তা হয়ে ওঠে ধ্বংসের হাতিয়ার।

সমাজে লজ্জার সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে

একসময় পরকীয়া মানেই ছিল লজ্জা, অসম্মান, সমাজচ্যুতি। এখন কেউ তা গোপন করতেও চায় না। বরং অনেকে বলে, আমিও তো মানুষ, ভালোবাসা আমারও অধিকার। আর এই আত্মপ্রবঞ্চনা আজ নৈতিকতাকে মেরে ফেলেছে। সমাজ এখন পরকীয়াকে ঘৃণা করে না, বরং গসিপ করে, উপভোগ করে।

 কিভাবে থামানো যায় এই আগুন

এই আগুন থামাতে শুধু আইন নয়, দরকার নৈতিক বিপ্লব। 

  • পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনা জাগানো: ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে শেখাতে হবে বিশ্বাস, দায়িত্ব ও ভালোবাসাই সম্পর্কের মেরুদণ্ড। 
  • প্রবাসীদের পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ানো: ভিডিও কল, নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলা।
  • মিডিয়ার দায়িত্ব: নাটক ও ওয়েবে “অবৈধ প্রেম”কে রোমান্টিকভাবে না দেখানো।
  • সামাজিক শাস্তি ও লজ্জা সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা: সমাজের নেতৃত্বকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে পরকীয়াকে লুকানো নয়, প্রতিরোধ করতে হবে। 
  • মানসিক কাউন্সেলিং ও সহায়তা: যারা মানসিক একাকীত্বে ভুগছেন, তাদের জন্য পরামর্শ কেন্দ্র ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।

ভালোবাসার অর্থ ফিরে পেতে হবে

পরকীয়া প্রেমের নামে আজ সমাজে যে অস্থিরতা, তা শুধু পরিবার ভাঙছে না মানবতার শিকড়েও আঘাত করছে। আর ভালোবাসা মানে শুধু আনন্দ নয়, দায়িত্বও বটে। যে নারী বা পুরুষ নিজের সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে অন্য কারও হাত ধরতে পারে, সে আসলে নিজের বিবেককেই হত্যা করে। পরকীয়া শুধু সম্পর্ক নয় এটি এক নীরব সামাজিক মহামারি, যা থামাতে হলে প্রতিটি পরিবারকে আত্মসমালোচনায় ফিরতে হবে।

আমাদের সমাজে বাবা-মা, সন্তান বা বংশ সবকিছুর মর্যাদা বাঁচাতে হলে প্রথমে নিজেদের হৃদয়ের দরজায় তালা দিতে হবে, যাতে অবিশ্বাসের বাতাস ঢুকতে না পারে। কারণ, একটি পরকীয়া শুধু একটি ঘর ভাঙে না, ভাঙে এক পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

পরকীয়ার আগুনে ভাঙছে সংসার, জন্ম নিচ্ছে খুনের মতো ভয়াবহ ঘটনা

দেশজুড়ে পরকীয়া প্রেমের জটিলতা এখন শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, সামাজিক অস্থিরতার এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় যা ছিল গোপন ও লজ্জার বিষয়, এখন তা পরিবার ভাঙার পাশাপাশি হত্যা ও আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।

জিদ, অপমান আর প্রতিশোধের আগুন

পরকীয়া সম্পর্কে জড়ানো নারী বা পুরুষ যখন ধরা পড়ে যায়, তখন অনেক সময় বিষয়টি থেকে জন্ম নেয় প্রবল ক্ষোভ ও অপমানবোধ। সেই ক্ষোভ থেকেই অনেকে চলে যায় প্রতিশোধের পথে। কখনও স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, কখনও স্ত্রী পরকীয়ার সঙ্গীকে হত্যা করছে, কখনও আবার পরিবার বা আত্মীয়রা ‘সম্মানের খাতিরে’ হত্যায় জড়িয়ে পড়ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, পরকীয়া সম্পর্ক ভাঙলে যেটি সবচেয়ে তীব্রভাবে আঘাত করে, সেটি হলো আত্মসম্মানের ক্ষত। একজন মানুষ যখন দেখে তার জীবনসঙ্গী অন্যের সঙ্গে যুক্ত, তখন নিজের মূল্যবোধ, সম্মান ও সামাজিক অবস্থান ভেঙে পড়ে। সেই অপমান অনেককে ঠেলে দেয় অন্ধ প্রতিশোধের দিকে।

ভালোবাসা থেকে প্রতিশোধের পথে

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, পরকীয়া প্রেমের কারণে স্বামী বা স্ত্রী হত্যা মামলার সংখ্যা বেড়েছে। এক সময় যে সম্পর্ক ভালোবাসার নামে শুরু হয়, সেটিই শেষে রক্তাক্ত পরিণতি নেয়।

একটি সম্পর্কের ভাঙন যখন জিদে পরিণত হয়, তখন আর যুক্তি কাজ করে না। অনেকেই ভাবে, আমি তাকে ভালোবেসেছি, তাই তার মৃত্যু ছাড়া শান্তি নেই। আর এই মানসিকতা থেকে ঘটছে পারিবারিক খুন, আত্মহত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের মতো অপরাধ।

সন্তান ও সমাজের ওপর প্রভাব

এই ধরনের ঘটনা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সন্তানদের মনে জন্ম দেয় ভয়, ঘৃণা ও নিরাপত্তাহীনতা। তারা দেখে, যাদের ভালোবাসা তাদের জন্ম দিয়েছে, তারাই একে অপরকে ধ্বংস করছে। সমাজে জন্ম নিচ্ছে অবিশ্বাস, আতঙ্ক এবং নৈতিক বিভ্রান্তি। আর একটি পরিবারের এই ভাঙন আসলে সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করছে।

সমাধান: বিশ্বাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

পরকীয়া প্রেমের মূল প্রতিষেধক হলো: বিশ্বাস ও আত্মসংযম। পরিবারের ভেতরে খোলামেলা যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা থাকলে এ ধরনের সম্পর্ক কখনো গড়ে ওঠে না।

বিশেষ করে প্রবাসী স্বামী বা স্ত্রীদের ক্ষেত্রে, দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও পারিবারিক সমর্থন জরুরি।

আজ পরিবার ভাঙছে, খুন হচ্ছে, সন্তানরা অনিশ্চয়তায় বড় হচ্ছে। আর সব কিছুর মূলে একটাই কারণ, নৈতিক অবক্ষয় ও আবেগের অনিয়ন্ত্রণ। ভালোবাসা যদি দায়িত্বহীন হয়, তবে সেটি শুধু সম্পর্ক নয়, জীবনও ধ্বংস করে দেয়। আর পরকীয়া প্রেমের আগুনে সমাজ যখন জ্বলছে, তখন প্রতিটি মানুষকেই নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হবে আমি কি ভালোবাসছি, নাকি প্রতিশোধ নিচ্ছি।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক

Link copied!