স্পোর্টস ডেস্ক
জুন ২৩, ২০২৬, ০২:১৪ পিএম
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের পাতাগুলো ওল্টালে বারবার একটি নামই স্বর্ণাক্ষরে ভেসে ওঠে, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। তিনি মাঠে নামা মানেই কোনো না কোনো রেকর্ডের ভাঙাগড়া এবং ফুটবলপ্রেমীদের জন্য জাদুকরী কোনো মুহূর্তের অবতারণা। আরও একবার এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
আগামী রোববার, যা ব্রিটিশ সামার টাইম বা ব্রিটিশ গ্রীষ্মকালীন সময় ভোর রাত ৩টা ও বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জর্ডানের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। আর এই ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির জন্য ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটিকে আরও উঁচুতে তুলে ধরার এবং আরও একটি অনন্য রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
ফুটবল ঈশ্বরের দেশ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার স্থান যে কতটা উঁচুতে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বকাপের মঞ্চে ম্যারাডোনার গোলসংখ্যা আটটি। এবার সেই আট সংখ্যার সমীকরণ এবং বিশ্বমঞ্চে নিজের রেকর্ডকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বুঁদ হয়ে আছেন মেসি। ইতিমধ্যেই মেসির পা থেকে আসা একটি রেকর্ডভাঙা গোলের ভিডিও এবং তাঁর প্রতিটি কোণের নিখুঁত বিশ্লেষণ ফুটবল বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জর্ডানের বিপক্ষে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটিকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মাঝে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আর্জেন্টিকার ফুটবলে ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসি, এই দুটি নামকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কে সেরা বা কে বেশি প্রভাবশালী, এই নিয়ে কফি টেবিল থেকে শুরু করে ফুটবলারদের ড্রেসিংরুম পর্যন্ত সর্বত্র আলোচনা চলে। ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ সালে একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, আর মেসি বহু বছরের অপেক্ষা শেষে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।
বিশ্বকাপের গোলসংখ্যার দিক থেকে ম্যারাডোনা আটটি গোল করে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন। মেসি ইতিমধ্যেই সেই রেকর্ড স্পর্শ এবং অতিক্রম করার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। রবিবারের জর্ডান ম্যাচটি মেসির সামনে এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে তিনি শুধু ম্যারাডোনার স্মৃতিকেই ছুঁয়ে ফেলবেন না, বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলের এমন কিছু রেকর্ড নিজের করে নেবেন যা ভাঙা আগামী কয়েক প্রজন্মেও কোনো ফুটবলারের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য কেবল গ্রুপ পর্বের একটি সাধারণ ম্যাচ নয়, এটি মেসির ইতিহাস গড়ার মঞ্চ। দলের কোচ এবং সতীর্থরাও মুখিয়ে আছেন মেসিকে এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করার জন্য।
গ্রুপ পর্বের এই চূড়ান্ত ম্যাচটির সময়সূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের দর্শকদের জন্য সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডানের মধ্যকার এই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে রবিবারে, যার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা।
যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের দর্শকদের জন্য এটি গভীর রাতের ম্যাচ হলেও, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে এক জমজমাট উইকএন্ড শো বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনের প্রদর্শনী। জর্ডান দল হিসেবে আর্জেন্টিনার চেয়ে কাগজে-কলমে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও, আন্তর্জাতিক ফুটবলে যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটতে পারে। বিশেষ করে মেসির আর্জেন্টিনাকে রুখে দিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এক রূপকথা লিখতে চাইবে জর্ডান। ফলে রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে তারা মেসিকে বোতলবন্দী করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, যা ম্যাচটিকে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে।
সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বে মেসির একটি বিশেষ গোল নিয়ে তোলপাড় চলছে। সেই গোলের ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়া এবং ক্রীড়া মাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যেখানে মেসির নিখুঁত ড্রিবলিং এবং গোল করার অবিশ্বাস্য জ্যামিতিক কোণগুলো দেখানো হয়েছে। সেই জাদুকরী গোল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ জন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে কিপারের ডান দিক দিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নতুন ফুটবল ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেসির এই গোলটি সাধারণ কোনো গোল ছিল না। এটি ছিল গতি, ভারসাম্য এবং ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। ভিডিওর বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল বা কোণ থেকে দেখা গেছে, মেসি যখন বলটি রিসিভ করেন, তখন তাঁর সামনে অন্তত তিনজন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিলেন। অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গার মধ্য দিয়ে শরীরকে বাঁকিয়ে তিনি ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করেন। এরপর গোলকিপারের পজিশন অনুমান করে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে বলটিকে পোস্টের দূরবর্তী কোণ দিয়ে জালে জড়ান।
এই ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রমাণ করে যে, বয়স বাড়লেও মেসির মাঠে থাকার ধার বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং তিনি আরও বেশি নিখুঁত এবং মারাত্মক হয়ে উঠেছেন। জর্ডানের ডিফেন্ডাররাও নিশ্চিতভাবেই এই ভিডিওটি দেখে মেসিকে আটকানোর ছক কষছেন, তবে মেসিকে আটকানো যে কতটা কঠিন, তা ইতিহাসই বলে দেয়।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচ তাঁর সেরা একাদশই মাঠে নামাতে পারেন, কারণ তিনি দলের জয়ের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি লিওনেল মেসিকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের সামনে কোনো রকম ঝুঁকিতে ফেলতে চান না। আর্জেন্টিনার বর্তমান দলটি অত্যন্ত গোছানো এবং তারা পুরোপুরি মেসি-কেন্দ্রিক ফুটবল খেলার চেয়ে টিম গেম বা দলীয় খেলার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মেসিকে মাঠে আরও স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ করে দিচ্ছে।
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য রণকৌশল হিসেবে প্রথমত মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের কথা বলা যায়। রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো মিডফিল্ডাররা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে মেসিকে বল সাপ্লাই দেওয়ার মূল দায়িত্বে থাকবেন। দ্বিতীয়ত, আক্রমণভাগের ধার বজায় রাখতে হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্টিনেজ প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখবেন, যাতে মেসি ডি-বক্সের আশেপাশে কিছুটা ফাঁকা জায়গা বা স্পেস পান।
তৃতীয়ত রয়েছে জর্ডানের রক্ষণ ভাঙার পরিকল্পনা। জর্ডান মূলত লো-ব্লক বা রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের রক্ষণ ভাঙতে মেসির দূরপাল্লার শট এবং পাসিং সেট-পিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি প্রায় সব বড় ট্রফি এবং ব্যক্তিগত পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। আটটি ব্যালন ডি'অর, বিশ্বকাপ ট্রফি, কোপা আমেরিকা এবং অসংখ্য ক্লাব ট্রফি তাঁর ক্যাবিনেটকে সমৃদ্ধ করেছে। তবুও ক্ষুধার্ত বাঘের মতো প্রতিটি ম্যাচেই তিনি নতুন রেকর্ডের সন্ধান করেন।
রবিবারের এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ম্যারাডোনার আট গোলের স্মৃতি যেখানে জড়িয়ে আছে, সেখানে মেসি নিজেকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যান, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা বিশ্ব। জর্ডানের বিপক্ষে গোল করে তিনি যদি আর্জেন্টিনাকে আরও একটি জয় এনে দিতে পারেন, তবে তা হবে তাঁর ক্যারিয়ারের মুকুটে আরও একটি নতুন পালক।
রবিবার সকাল ৮ টায় যখন রেফারি বাঁশি বাজাবেন, তখন কোটি কোটি চোখ থাকবে কেবল ওই ১০ নম্বর জার্সিধারী জাদুকরের পায়ের দিকে। কারণ সবাই জানেন, মেসি মাঠে থাকা মানেই যেকোনো মুহূর্তে ইতিহাস নতুন করে লেখা হতে পারে।
জেএইচআর