হাশেম রেজা
অক্টোবর ২৫, ২০২৫, ০৫:৩৭ পিএম
মানবজীবনের মূল ও মর্ম হলো ঈমান। এটি এমন এক আলো, যা হৃদয়কে আলোকিত করে, চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রকে শুদ্ধ করে এবং জীবনের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে। ঈমান ছাড়া মানুষ যত জ্ঞানী, ধনী বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তার জীবন শূন্য ও অর্থহীন হয়ে পড়ে। অপরদিকে, কুফরি সেই অন্ধকার শক্তি, যা মানুষকে সত্য ও আলোর পথ থেকে বিচ্যুত করে-মানবতার অন্তরে অমানুষিকতা ও অহংকারের বিষ ছড়িয়ে দেয়।
ঈমানের অর্থ ও তাৎপর্য
'ঈমান' শব্দটি আরবি ‘আমানা’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিশ্বাস করা, নিশ্চিন্ত হওয়া, আস্থা স্থাপন করা। ইসলামী পরিভাষায় ঈমান অর্থ-আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত বার্তাসমূহে অন্তর দিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং তা মুখে স্বীকার করা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আর তারা সত্যের সাক্ষ্য দেয়। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৩৭)
ঈমানের মাধ্যমে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনে নেয়, নিজের অবস্থান বুঝে নেয়, আর জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়। একজন মুমিনের কাছে জীবন শুধুমাত্র দেহগত অস্তিত্ব নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণই তার জীবনের প্রকৃত অর্থ।
ঈমানের স্তম্ভসমূহ
হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেন, ঈমান হলো, তুমি বিশ্বাস রাখবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলদের প্রতি, পরকাল ও তাকদিরের প্রতি-এর মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে। (সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ ঈমান ছয়টি মৌলিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
এই ছয়টি উপাদান পরস্পর সম্পর্কিত। একটিকে অস্বীকার করলে পুরো ঈমান ব্যর্থ হয়ে যায়।
ঈমানের বাহ্যিক ও অন্তর্গত দিক
ঈমান কেবল মুখের স্বীকারোক্তি নয়, এটি হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস ও কর্মের প্রকাশ। ইসলামী চিন্তায় ঈমানের তিনটি দিক উল্লেখ করা হয়-
এ কারণেই আল্লাহ বলেন, ঈমান ও সৎকর্ম পরস্পর সম্পর্কিত। (সূরা আল-আসর)
কেউ যদি মুখে মুসলমান বলে অথচ কাজ-কর্মে ইসলামের আদেশ অমান্য করে, তবে তার ঈমান দুর্বল হয়ে যায় বা নষ্টও হতে পারে। তাই ঈমান কেবল মুখের কথা নয়-এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ঈমানের শক্তি ও ফলাফল
ঈমান মানুষকে সাহস, স্থিতিশীলতা ও আত্মসম্মান দেয়। একজন প্রকৃত মুমিন কখনও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন যে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আমি তাকে সুখী জীবন দান করব। (সূরা নাহল, আয়াত ৯৭)
ঈমানের ফল হলো: তাওহিদের চেতনা-মানুষ বুঝতে শেখে যে সবকিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এই উপলব্ধি তাকে দুনিয়ার মোহ ও ভয় থেকে মুক্ত করে, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণা দেয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, নবী করিম (সা.) ও সাহাবারা ঈমানের শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মক্কার অন্ধকার যুগ থেকে মানবতার আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঈমান ছিল তাদের বিপ্লবের জ্বালানি, ন্যায়ের সংগ্রামের প্রেরণা।
কুফরি কী ও তার ধরন
‘কুফর’ শব্দের অর্থ ঢেকে ফেলা, অস্বীকার করা। ইসলামী পরিভাষায় কুফর হলো, আল্লাহ, তাঁর রাসুল, কিতাব, বা তাঁর নির্দেশসমূহের কোনোটি অস্বীকার করা বা অবিশ্বাস করা।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে কেউ ঈমানের পরে কুফরি করে, সে অবশ্যই পথভ্রষ্ট। (সূরা আন-নাহল, আয়াত ১০৬)
কুফরিরও বিভিন্ন ধরন আছে:
কুফরি মানুষকে ঈমানের আলো থেকে বঞ্চিত করে, নৈতিক পতনের গভীরে ঠেলে দেয়। এ কারণেই ইসলাম কুফরিকে শুধু ধর্মীয় নয়, নৈতিক বিপর্যয় হিসেবেও দেখে।
ঈমান ও কুফরির পার্থক্য
ঈমান ও কুফরির মধ্যে পার্থক্য এক অদৃশ্য রেখার মতো-কিন্তু তার প্রভাব অপরিসীম। ঈমান মানুষকে আল্লাহর দিকে টানে, কুফরি তাকে নিজ অহংকারের দাস বানায়। ঈমান মানুষকে শান্তি ও ন্যায়ের পথে চালিত করে, কুফরি জন্ম দেয় ভয়, হিংসা ও অনিশ্চয়তা। ঈমান আলোর উৎস, কুফরি অন্ধকারের প্রতীক।
কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মুমিনদের অন্ধকার থেকে আলোতে বের করেন, আর কাফিররা শয়তানের পথে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৭)
কুফরির কারণ ও পরিণতি
কুফরির প্রধান কারণ হলো অজ্ঞতা, অহংকার ও দুনিয়ার মোহ। অনেকে সত্য জানলেও নিজেদের স্বার্থের কারণে তা অস্বীকার করে। ফেরাউন, আবু জাহল কিংবা নামরূদের মতো উদাহরণগুলো দেখায়-কুফরি কখনও জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং হৃদয়ের অন্ধকারে জন্ম নেয়।
এর পরিণতি ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন, যারা কুফরি করে, তাদের জন্য আছে কঠোর শাস্তি, আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আছে জান্নাত। (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত ৬-৭)
ঈমান রক্ষার উপায়
একজন মুসলমানের জন্য ঈমান রক্ষা করা জীবনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। বর্তমান বিশ্বে নানা প্রলোভন, নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদের ঝড় আমাদের চারপাশ ঘিরে ধরেছে। এই অস্থির পরিবেশে ঈমান টিকিয়ে রাখতে হলে-
নবী করিম (সা.) বলেছেন, যার ঈমান আল্লাহ ও পরকালের প্রতি, সে যেন কল্যাণের কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ ঈমান শুধু হৃদয়ে নয়, আচরণেও প্রতিফলিত হতে হবে।
বর্তমান সমাজে ঈমানের চ্যালেঞ্জ
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি, অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভনে মানুষ ঈমানের মূল চেতনাকে ভুলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনীতি বা অর্থনীতিতে অন্যায়, প্রতারণা ও স্বার্থপরতা ঈমানের দুর্বলতারই চিত্র।
ইসলাম বলে, সত্যিকার মুমিন সেই, যার হাত ও জবান থেকে অন্য কেউ কষ্ট পায় না। যদি আমরা সত্যিই ঈমানদার হতে চাই, তবে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নৈতিকতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ঈমান ও কুফরি-এই দুই শক্তির সংঘাত আদম (আ.) এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত চলছে। যে হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বলে, সে অন্যায়ের অন্ধকারে হারিয়ে যায় না। কিন্তু যে কুফরির অন্ধকারে নিমজ্জিত, তার কাছে সত্যও অসত্য মনে হয়।
আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন-ঈমানকে পুনর্জাগরিত করা, আল্লাহর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা, মানবতার মর্যাদা পুনঃস্থাপন করা। কারণ ঈমানই হলো সেই চাবিকাঠি, যা দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির দরজা খুলে দেয়।
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসুলের প্রতি। (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৩৬)
জেএইচআর