হাশেম রেজা
জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনে কেবল ৩০০ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট পড়বে না, বরং একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক 'গণভোট'। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন বা জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যুতে জনগণের সরাসরি রায় নেওয়ার এই পদ্ধতি দীর্ঘ সময় পর আবার ফিরে এসেছে।
একটি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা যেখানে যেকোনো নির্বাচন কমিশনের জন্য হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ, সেখানে একই দিনে গণভোট পরিচালনা করা প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত, আজ সেই বিশ্লেষণই সময়ের দাবি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। এক দিনে দুটি আলাদা ব্যালট পেপারে (একটি প্রার্থীর জন্য, অন্যটি গণভোটের 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোটের জন্য) রায় দেবেন নাগরিকরা। এটি প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া।
কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, তা হলো ইতোমধ্যেই দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং ভোটারদের আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।
তবে প্রস্তুতির আসল চ্যালেঞ্জটি হলো ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ। প্রায় ৭-৮ লাখ প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারকে একযোগে দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার ভোট গণনা এবং ফলাফল সমন্বয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল ঘোষণার প্রস্তুতি সম্পন্ন।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির চেয়েও বড় হলো মাঠপর্যায়ের সমন্বয়। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায় ব্যালট পেপার পৌঁছানো এবং গণভোটের সঠিক ব্যাখ্যা সাধারণ ভোটারের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি বড় কাজ হিসেবে রয়ে গেছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ১২ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সরকার দেশব্যাপী একটি 'ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা বলয়' তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এই পরিকল্পনায় পুলিশ, র্যাব, আনসার সদস্যের পাশাপাশি মোতায়েন করা হচ্ছে সশস্ত্র বাহিনী বা সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনী ও স্ট্রাইকিং ফোর্স: এবার নির্বাচনে 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর অধীনে সেনাবাহিনী কেবল টহলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি ভোটারদের মনে নিরাপত্তা বোধ তৈরি করবে।
গোয়েন্দা তৎপরতা: নির্বাচনের অন্তত ১৫ দিন আগে থেকেই 'ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স' সক্রিয় করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা রাজনৈতিক সহিংসতা সৃষ্টি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ: নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তালিকায় প্রায় ২৫ শতাংশ কেন্দ্রকে 'অধিক গুরুত্বপূর্ণ' বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি অতিরিক্ত সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে।
সরকারের প্রস্তুতি কেবল প্রশাসনিক বা সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থার ওপরও নির্ভরশীল। কোনো একটি বড় রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচন বর্জন করে বা রাজপথে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে যে রাজনৈতিক উত্তাপ দেখা যাচ্ছে, তা নিবারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করেছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বল প্রয়োগ না করে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কারণ, যেকোনো অতি-উৎসাহী পদক্ষেপ নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত করতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, সেই তুলনায় গণভোটের বিষয়বস্তু নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা কম। সরকার এবং ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভোটাররা যেন ব্যালট হাতে পেয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পড়েন। গণভোটের প্রশ্নটি সহজবোধ্য হওয়া জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এখানে বাড়তি চ্যালেঞ্জ হলো ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের দ্বিবিধ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই দ্বৈত নির্বাচনে অপরিহার্য।
১২ ফেব্রুয়ারির এই 'ডাবল ইলেকশন' লজিস্টিক সাপ্লাই চেইনের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ২৫ কোটি ব্যালট পেপার মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েক লাখ স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও সিলমোহর। গ্রামপর্যায়ের ভোটকেন্দ্রগুলোতে এই বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্কর্ট বা প্রহরা নিশ্চিত করা একটি বড় কাজ।
এছাড়া, ভোট গণনার সময় প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের ওপর যে মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি হবে, তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বিকল্প জনবল বা 'রিজার্ভ ফোর্স' প্রস্তুত রাখা জরুরি। গণভোটের ফলাফলের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় এখানে সামান্য ভুলও বড় ধরনের সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং কমনওয়েলথ থেকে পর্যবেক্ষক দল আসার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই চাপের মুখে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হবে।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য এক বাড়তি লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, বরং সুশীল সমাজ ও প্রচারমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভোটারদের দ্বৈত ভোটের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করা এবং গণভোটের গুরুত্ব বোঝাতে নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো অপপ্রচার বা 'ডিপ ফেক' ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকতে হবে। গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে, তবে প্রশাসনের ওপর একটি পরোক্ষ নজরদারি বজায় থাকবে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক।
এত প্রস্তুতির মাঝেও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। প্রথমত, নির্বাচনী ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এক দিনে দুই ভোট নেওয়ায় কাগজের ব্যবহার থেকে শুরু করে কর্মী খরচ প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যেন কোনো বিশেষ পক্ষের হয়ে কাজ না করে, সেটি নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, ভোট পরবর্তী সহিংসতা রোধ। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর জয়ী ও বিজিত পক্ষের মধ্যে যে রেষারেষি শুরু হয়, তা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর দ্বৈত নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি কাগজে-কলমে বেশ শক্তিশালী। মাঠপর্যায়ে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের যে সমন্বয় আমরা দেখছি, তা আশাব্যঞ্জক। তবে আসল পরীক্ষা হবে ভোটের দিন। ব্যালট বাক্সে জনগণের রায়ের প্রতিফলন কতটা স্বচ্ছভাবে ঘটে এবং ভোট পরবর্তী সহিংসতা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সরকারের সাফল্যের খতিয়ান।
দেশবাসী এখন কেবল একটি তারিখের অপেক্ষা করছে না, তারা অপেক্ষা করছে একটি নির্ভয় এবং উৎসবমুখর ভোটিং অভিজ্ঞতার। রাষ্ট্রযন্ত্র সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে-১২ ফেব্রুয়ারির সূর্যাস্তই দেবে সেই উত্তর।
যদি এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায়, প্রস্তুতির সামান্য ঘাটতিও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংকটের দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
জেএইচআর