ক্রীড়া প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ মানেই কেবল চার-ছক্কার লড়াই নয়, এটি যেন মাঠের ভেতরে ও বাইরের এক স্নায়ুযুদ্ধ। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর পাকিস্তান দলের সম্ভাব্য ‘বয়কট’ গুঞ্জনের মেঘে ঢাকা পড়েছে সেই রোমাঞ্চ। তবে মাঠের খেলায় অনিশ্চয়তা থাকলেও মাঠের বাইরের নিরাপত্তায় কোনো খামতি রাখছে না সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা। লঙ্কান সরকার এই ম্যাচের জন্য তাদের দেশের বিশেষায়িত এলিট সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে।
শ্রীলঙ্কার ক্রীড়ামন্ত্রী সুনিল কুমারা গামাগে বার্তা সংস্থা এএফপি-কে নিশ্চিত করেছেন যে, টুর্নামেন্টটি সফলভাবে আয়োজন করা তাদের জাতীয় অগ্রাধিকার। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচকে কেন্দ্র করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে।
পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা ভিভিআইপিদের সুরক্ষায় যে এলিট কমান্ডো ইউনিটগুলো কাজ করে, এবার তাদেরকেই ক্রিকেট দলগুলোর নিরাপত্তায় নিয়োগ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে টিম হোটেল এবং হোটেল থেকে স্টেডিয়াম—প্রতিটি পদক্ষেপে সশস্ত্র পাহাড়ায় থাকবে বাবর আজম ও রোহিত শর্মাদের দল।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতা গত বছর চার দিনের সীমান্ত সংঘর্ষের পর আরও চরম আকার ধারণ করেছে। নিরাপত্তা অজুহাতে পাকিস্তান ক্রিকেট দল ভারতে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি তাদের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়। শ্রীলঙ্কায় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত মোট ২০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। এর মূলে রয়েছে বাংলাদেশ ইস্যু। নিরাপত্তা আশঙ্কার কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে খেলতে আপত্তি জানালে আইসিসি তা নাকচ করে দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ দলের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রতিবেশী এবং বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও এই টুর্নামেন্ট বা পুরো ভারত-ম্যাচ বয়কট করতে পারে—এমন জল্পনা এখন তুঙ্গে। পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি জানিয়েছেন, পাকিস্তান খেলবে কি না সে সিদ্ধান্ত আগামীকাল অথবা আগামী সোমবারের মধ্যে জানানো হবে। পাকিস্তানের এই সম্ভাব্য বয়কট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই ত্রিদেশীয় স্নায়ুযুদ্ধে শ্রীলঙ্কা সচেতনভাবেই নীরবতা পালন করছে। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সচিব বান্দুলা দিসানায়েকে স্পষ্ট করেছেন যে, তারা কোনো আঞ্চলিক বিরোধে জড়াতে চান না। তাঁর ভাষায়, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—সবাই আমাদের বন্ধু। আমরা কেবল খেলার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। আইসিসি-র সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বাদ পড়লেও শ্রীলঙ্কা ভবিষ্যতে যেকোনো দেশের জন্য ‘নিরপেক্ষ ভেন্যু’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ম্যাচ হবে কি হবে না—এই দোলাচলের মধ্যেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিটের চাহিদা আকাশচুম্বী। কলম্বোর হোটেলগুলো ইতোমধ্যেই বুক হয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তানের বয়কট সিদ্ধান্ত যদি শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়, তবে হাজার হাজার সমর্থক যেমন হতাশ হবেন, তেমনি বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে আইসিসি এবং সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো।
ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখন জাতীয়তাবাদের চরম পরীক্ষা। শ্রীলঙ্কা তাদের এলিট কমান্ডো দিয়ে মাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেও, রাজনৈতিক টেবিলের অনিশ্চয়তা দূর করার ক্ষমতা তাদের নেই। এখন সবার চোখ লাহোর এবং দুবাইয়ের (আইসিসি সদর দপ্তর) দিকে—পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত কলম্বোর সবুজ ঘাসে ভারতের মুখোমুখি হবে, নাকি রাজনৈতিক অভিমান মাঠের ক্রিকেটকে হার মানাবে?
এএন