স্পোর্টস ডেস্ক
জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের পর স্পেনে যখন আনন্দের ঢেউ, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য সেই উদযাপনে কালো ছায়া ফেলেছে। ঐতিহাসিক এই সাফল্যের পরও স্পেনের তরুণ তারকা ফুটবলার লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে অনলাইনে ব্যাপক বিদ্বেষমূলক আক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে।
স্পেনের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘স্প্যানিশ অবজারভেটরি অন রেসিজম অ্যান্ড জেনোফোবিয়া’-এর প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালে অনলাইনে ঘৃণা ও বৈষম্যমূলক প্রচারণার পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই অনলাইনে বৈষম্যমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রায় ৪০ হাজার ৮৬১টি কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে ছড়ানো ঘৃণামূলক বার্তার হার ছিল ১৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৬৯ শতাংশ বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট ছিল ‘জননিরাপত্তা’ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়কে ঘিরে।
বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন দেশের দল, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য ছড়ানো হলেও সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন স্পেনের ১৭ বছর বয়সী তারকা লামিনে ইয়ামাল। তার পারিবারিক পরিচয় ও ধর্মীয় পটভূমিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অপমানজনক মন্তব্য করা হয়েছে।
স্পেনে জন্ম নেওয়া ইয়ামাল স্পেন জাতীয় দলের হয়ে খেললেও তার পারিবারিক শিকড় ভিন্ন। তার বাবা মরক্কোর নাগরিক এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির নাগরিক। বৈচিত্র্যময় এই পরিচয় স্প্যানিশ সমাজের বহুত্ববাদকে তুলে ধরলেও অনলাইনে সেটিকেই অনেক সময় বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের ম্যাচের আগে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়ের একটি কলামকে ঘিরেও পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ওই লেখায় তিনি ফ্রান্স দলকে ‘ফরাসিবিহীন দল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইয়ামাল কোনো বিতর্কে না গিয়ে ফুটবলকে সামাজিক ঐক্যের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ফুটবলের যদি কোনো মূল উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে তা হলো সমাজকে একত্রিত করা।”
তবে ফাইনালের আগেও ইয়ামালকে ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত থাকে। এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিক তার মরক্কান বংশোদ্ভূত পরিচয় নিয়ে মন্তব্য করলে স্পেনে সেটিকে ইয়ামালকে হেয় করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। ওবের্যাক্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্লেষণ করা ঘৃণামূলক বার্তার ৮৮ শতাংশই উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের লক্ষ্য করে ছড়ানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বার্তার ধরন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অমানবিক হিসেবে উপস্থাপন করা বা চরম অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের হার এক মাসে বেড়ে ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ৩২ শতাংশ বার্তায় অভিবাসীদের ‘হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং ১০ শতাংশ পোস্টে তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ৬ শতাংশ বার্তায় সরাসরি সহিংসতার উসকানি দেওয়া হয়েছে।
ঘৃণা ছড়াতে ছবি, ভিডিও, মিম ও প্রতীকী ভাষার ব্যবহারও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কনটেন্ট শনাক্ত করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠেছে। রিপোর্ট করা বিদ্বেষমূলক পোস্টের মধ্যে মাত্র ৬১ শতাংশ সরানো হয়েছে। এর মধ্যে টিকটক ৯৮ শতাংশ এবং এক্স (সাবেক টুইটার) ৯৩ শতাংশ কনটেন্ট অপসারণ করলেও ফেসবুক ৬২ শতাংশ, ইনস্টাগ্রাম ৩২ শতাংশ এবং ইউটিউব মাত্র ৮ শতাংশ পোস্ট সরাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে ইয়ামালসহ বেশ কয়েকজন তারকাকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টও ছড়িয়ে পড়ে। ইয়ামালের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্যে একটি এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও প্রচার করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, স্প্যানিশ সংবাদ চ্যানেল ‘ক্যানাল ২৪ হরাস’ নাকি ইয়ামালের বিরুদ্ধে উগ্রবাদসংক্রান্ত তদন্তের খবর প্রচার করেছে।
ওবের্যাক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন ঘৃণার প্রভাব এখন শুধু ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন ও বিদ্বেষ বাড়াচ্ছে। বিশ্বকাপের মাঠে সাফল্যের শিখরে ওঠা ইয়ামালদের মতো তরুণ খেলোয়াড়দের একই সঙ্গে ডিজিটাল দুনিয়ার এই নেতিবাচক বাস্তবতারও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আনাদলু এজেন্সি
এএন