অক্টোবর ১১, ২০২২, ০৩:৫৪ এএম
‘ওরা মারামারি করলে, আমাগো লোকজনরে কইয়া দিছি রামদা লইয়া ওপেন মিছিল করতে। কামাল খানরে শুদ্দা কোপাইতে কইছি। ফাইজলামি করলে কিন্তু কামাল খান কোপ খাইবে। আপনে কইয়া দেন যে সিদ্ধান্ত হইছে। মেয়র সামনে পড়লে মেয়রকেও কোপাইবো। যে সামনে পড়বে হ্যারেই কোপাইবে কেমন।’
ওসিকে বলা এমন কথোপকথন ফাঁস হয় বরিশাল-৪ আসনের এমপি সদস্য পংকজ নাথের। কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িলে পড়লে এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় হয়। এর মাস দুয়েক আগেই ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের এক নেত্রীর কল রেকর্ড ফাঁস হয়। বাদ যাননি রাষ্ট্রের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও। তাদের একান্ত কথোপকথন ফাঁস হয়। যা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
তবে তাদের রেকর্ড যারা ফাঁস করেছেন সেই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে খোদ আইনমন্ত্রী এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু পঙ্কজ দেবনাথই নয়, সম্প্রতি কল রেকর্ড ফাঁসের প্রবণতা বেড়েছে। এতে ব্যক্তি নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ব্যক্তির গোপনীয় আলাপচারিতা ফাঁস হচ্ছে। ফাঁস হওয়ার পরই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রচার করা হচ্ছে টেলিভিশনেও।
এমন ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটছে। তবে ফাঁস হওয়া রেকর্ডের দায় নিচ্ছে না কেউ। তদন্তও হয় না। কে বা কারা রেকর্ড ফাঁস করছে তারও হদিস মিলছে না। ফলে আইনি পদক্ষেপও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। একের পর এক দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। তবে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি।
বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বিচার হয়েছে এমন নজিরও নেই। উল্টো ফাঁস হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মামলা সাজানোর ঘটনা ঘটেছে অহরহ। বৈধ যোগাযোগের গোপনীয়তা সংরক্ষণ সংবিধানবলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও অহরহ ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির একটি লিগ্যাল নোটিসও পাঠান। নোটিসে বলা হয়— সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে ফ্রি-স্টাইলে ফোনালাপ রেকর্ড ও ফাঁসের এই বেআইনি কাজ বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ কী? তবে আগেও আড়িপাতা রোধে প্রতিকার চেয়ে একাধিকবার লিগ্যাল নোটিস পাঠালেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব মেলেনি।
জানা গেছে, ব্যক্তিগত ফোনে আড়িপাতা ও রেকর্ড ফাঁস করা নিষিদ্ধ ছিল। ছিল কঠোর শাস্তির বিধানও। তবে ২০০৬ সালে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন ঘটে। এতে ২০০১ সালের টেলিকমিউনিকেশন আইনকে সংশোধন করে নাগরিকদের টেলিফোন রেকর্ড করার অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয় সরকারকে। এ কাজে টেলিযোগাযোগ সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সহায়তা না করলে ‘৯৭-গ’ ধারায় তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে ওই বছরই ২০০৬ সালে এ বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনটি কেন বেআইনি ও সংবিধানবিরোধী নয়, তা ব্যাখ্যা করতে রুলও জারি করে। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই রুলের জবাব দেয়নি। জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকে। আজ পর্যন্ত ওই মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি; বরং সংশোধিত ওই আইন কার্যকরের জন্য ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি।
২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট রাষ্ট্র বনাম অলি মামলায় হাইকোর্টের একটি রায়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটি ও টেলিফোন কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব রয়েছে এ সংক্রান্ত নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার মেনে চলার এবং তারা সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন মোতাবেক ছাড়া তাদের গ্রাহকের কোনো তথ্য কাউকে দিতে পারে না। তবে আদালতের রায়ের পরও সমপ্রতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির রেকর্ড ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। গত এক যুগে ফোনালাপ ফাঁসের বড় ঘটনা হলো— প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ফোনালাপ ফাঁস। তবে সেই ফোনালাপ কারা ফাঁস করেছে সেটি তদন্তের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও দেখা যায়নি; বরং গত নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের একাধিক নেতার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ কয়েকটি টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, রেকর্ড ফাঁসে গোয়েন্দা সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা তাদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। এখন তাদের কেউ যদি অপব্যবহার করে তাহলে কী হবে এটি কোথাও বলা নেই। এই জায়গাটায় আইনের একটি দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর আইনের এই ধারাটি তাদের জন্য বড় একটি রক্ষাকবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোনে আড়িপাতা ও ফোনালাপ প্রকাশ নিয়ে আইনে সুস্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। আর এখন পর্যন্ত ফোনালাপ ফাঁসের সাথে জড়িত কারো সাজা হয়েছে এমন কোনো নজিরও নেই। সুতরাং এই আইন করেও কোনো ফায়দা হয়নি।
তাদের দাবি, কল রেকর্ড ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধের টেলিকমিউনিকেশন্স আইন-২০১০ সংশোধনীতে যে সাজার কথা উল্লেখ রয়েছে সেটি নামমাত্র। এ আইনে সাজা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। কেউ যদি মনে করেন এ ধরনের ঘটনার জন্য তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে সে ক্ষেত্রে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আড়িপাতার মাধ্যমে অন্যের টেলিফোন কথোপকথন রেকর্ড করার অধিকার সংশ্লিষ্ট সংস্থা ছাড়া অন্য কারো সুযোগ নেই। তাই এর উৎস খুঁজে বের করতে সরকারেরই ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন।
আইনজীবীরা বলেছেন, রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর তদন্ত হওয়া উচিত যেকোনো উৎস থেকে সেটি ফাঁস করা হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি তদন্ত হয়েছে এমন নজির নেই। শাস্তি তো পরের বিষয়। কিন্তু উল্টো যাদের রেকর্ড ফাঁস হয়েছে তাদের নামে একাধিক মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। যার ফলে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।
এদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরটা জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী তারা ভয়েস কল রেকর্ড রাখতে পারে না, শুধু কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) রাখতে পারে। সিডিআর হচ্ছে কোনো গ্রাহক কার কাছে কী কল করেছে বা তাকে কে কল দিয়েছে, তার রেকর্ড। ফোর-জি নীতিমালা অনুযায়ী এই রেকর্ড অপারেটরদের কাছে দুই বছরের জন্য সংরক্ষিত থাকে। আবার যে কেউ চাইলেই এ সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে না আইন অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা এই সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে। ওই তালিকার বাইরে কেউ সিডিআর সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে না। ভয়েস কল রেকর্ড মোবাইল ফোন অপারেটররা না রাখলেও সরকারি কোনো কোনো সংস্থা ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখে এবং মোবাইল ব্যবহারকারী কোন এলাকায় রয়েছে বা তার গতিবিধিও তারা শনাক্ত করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘কারো ফোনে আড়িপাতা সংবিধানের লঙ্ঘন। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদানের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি হবে। আর এ ধরনের অপরাধের জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়ে প্রতিকার পাওয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়াও আইনের মাধ্যমে আড়িপাতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, রেকর্ড ফাঁস হচ্ছে হরহামেশাই। তবে এগুলোর তদন্ত হয় না। কারা এটি ফাঁস করেছে তার তদন্ত করা গেলে এবং বিচারের আওতায় আনা গেলে ফাঁস হওয়ার প্রবণতা কমে আসত। ফোন কোম্পানি বা কলসেন্টারগুলো গ্রাহকের কোনো অনুমতি ছাড়াই কল রেকর্ড করছে। এই রেকর্ডে গ্রাহকের সম্মতি আছে কি-না নেই, সে বিষয়ে কোনো অপশন রাখা হয়নি। অনুমতি ছাড়া গ্রাহকের ফোন রেকর্ড করার বিষয়ে আইনে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে এই রেকর্ড দ্বারা কারও প্রাইভেসি নষ্ট হলে কী করণীয় সে বিষয়ে ব্যাখ্যা আছে। গ্রাহকের দেয়া কল দিয়ে প্রশিক্ষণ কিংবা পর্যালোচনা করার কোনো আইন নেই। যদি কোনো গ্রাহক এটি না চান তা হলে বিটিআরসিতে অভিযোগ জানাতে পারেন। আর এই রেকর্ড যদি কোনো থার্ড পার্টিকে দেয়া হয় এবং তা দিয়ে যদি ওই ব্যক্তির প্রাইভেসি নষ্ট হয় তাহলে আদালতে মামলা করতে পারবেন। সেই সাথে তাকে উল্লেখ করতে হবে, কোন কথাটি দিয়ে তার প্রাইভেসি নষ্ট হয়েছে।’
সংবিধানের ৪৩(খ) ধারায় বলা আছে— চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ে গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (২৬) ধারায় অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ-১২) নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিক সনদ (অনুচ্ছেদ-১৭) জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ-১৪) এবং শিশু অধিকার সনদে (অনুচ্ছেদ-১৬) গোপনীয়তাকে অধিকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
