ডিসেম্বর ৩, ২০২২, ০১:২১ এএম
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী দুই সন্তানের পর সন্তান গ্রহণে অনিচ্ছুক। অথচ স্বাধীনতার সময় একজন মা গড়ে সাত সন্তান জন্ম দিতেন। এখন সেটা নেমে দাঁড়িয়েছে দুই দশমিক তিন শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি বছরের মধ্যে প্রজনন হার দুই শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে কাজ চলমান রয়েছে। তার মানে প্রতিটি ঘরে এখন দুই সন্তানে ‘ফুল স্টপ’ দিচ্ছেন দম্পতিরা। কারণ ইতোমধ্যে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনতেও সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিদানস্বরূপ এমডিজি (সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) পুরস্কার অর্জন করেছে বাংলাদেশ। মাতৃমৃত্যু হার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে এমডিজি অ্যাওয়ার্ডের মতো এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অ্যাওয়ার্ড অর্জনের গৌরবময় হাতছানি। প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার রোধসহ বেশ কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে নিরলস কাজ করছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীরা।
এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে সন্তান জন্মদানে মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ৭০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে হবে।
প্রথমত, অল্প বয়সে বিয়ে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অল্প বয়সে প্রেগন্যান্সি বন্ধ করতে হবে এবং তৃতীয়ত, ঘন ঘন সন্তান নেয়া বন্ধ করতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মূল উদ্দেশ্য শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমানো। দেশে এখনও সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে ১৬৩ জন মারা যান।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পিত পরিবার গঠনের কারণে সবার মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে। এতে করে দেশের প্রত্যাশিত গড় আয়ুও বেড়েছে। ১৯৯১ সালে দেশের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৫৬ দশমিক এক বছর।
২০২০ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক আট বছর। তার মধ্যে পুরুষ ৭১ দশমিক দুই বছর আর নারী ৭৪ দশমিক পাঁচ বছর। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক থাইল্যান্ডের পাতায়া এক্সিভিশন অ্যান্ড কনভেনশন হলে পার্টনারশিপ ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (পিপিডি) আয়োজিত বাংলাদেশসহ ২৭ দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধি পর্যায়ের জনসংখ্যা এবং উন্নয়নবিষয়ক ১৯তম আন্তর্জাতিক আন্তঃসরকার পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে নারী ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০২২ সালে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ২২ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার প্রতি এক হাজারে ২৮ জন থেকে হ্রাস পেয়ে এখন ১৫ জনে নেমে এসেছে। ২০০৯ সাল থেকে বর্তমানে প্রায় ৫০ ভাগ শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৪ ভাগ নারী (১৫-৪৯ বছর বয়সি) গর্ভনিরোধ পদ্ধতি সেবা সরকারিভাবে বিনামূল্যে পাচ্ছে। মাতৃমৃত্যুর হার ২০০৯ সালে প্রতি লাখে ২৫৯ জন থেকে কমিয়ে এখন ১৬৩ জন হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ছাড়াও মা ও শিশু স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টিসেবা নিয়ে কাজ করে। পরিকল্পিত পরিবার গঠন পরিবার পরিকল্পনার মূল বিষয়। কারণ, পরিকল্পিত পরিবার হলো আলোকিত পরিবার। পরিকল্পিত পরিবার গঠন করতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ হবে এবং মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে। নিরাপদ প্রসব নিশ্চিতকরণে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরাধীন তিন হাজার ৬৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে দুই হাজার ৮৬০টি কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ প্রসব সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া ৯৬টি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৭০টিতে জরুরি প্রসূতি সেবা দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বড় সফলতা হলো, প্রতিষ্ঠানটির নানা কর্মতৎপরতায় বর্তমানে দেশে মোট প্রজনন হার প্রায় দুই শতাংশে নেমে এসেছে।
২০২০ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) তথ্যমতে, বর্তমানে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে দুই সন্তানবিশিষ্ট ৭৯ শতাংশ নারী পরবর্তী সন্তান গ্রহণে অনিচ্ছুক, যা ২০০৪ সালে ছিল ৬৭ শতাংশ। ১৯৭৫ সালে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ছিল সাত দশমিক সাত শতাংশ। ২০১৭ সালে ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নতি হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার আট দশমিক ছয় শতাংশ। ২০২২ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। সক্ষম দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির অপূর্ণ চাহিদা ১২ শতাংশ থেকে চলতি বছরে মধ্যে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনারও ঘোষণা রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ছিল ছয় দশমিক ৯, অর্থাৎ ওই সময়ে একজন মা গড়ে প্রায় সাত সন্তানের জন্ম দিতেন। ১৯৭৫ সালে প্রজনন হার ছিল ছয় দশমিক তিন, ১৯৮১ সালে এটি কমে দাঁড়ায় ছয় দশমিক দুই-এ। এরপর তা আরও কমতে থাকে। ২০১৭ সালে নামিয়ে আনা হয়েছে দুই দশমিক শূন্য চার জনে।
সর্বশেষ (২০২০ সাল) বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, দেশের প্রজনন হার এখন দুই দশমিক পাঁচ জনে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে চলতি বছরের মধ্যে দুই শতাংশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা সরকারের। প্রতি হাজারে নবজাতক শিশুমৃত্যুর সংখ্যা এখন ১৫ জনে রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে ১২ জনে নামিয়ে আনার জন্য কাজ করছে অধিদপ্তর।
পঞ্চাশ দশকের গোড়াতে স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগে বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ইতিহাস সূচনা হয়। কর্মসূচির গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৬৫ সালে পরিবার পরিকল্পনাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং সরকারিভাবে পরিবার পরিকল্পনা সেবাদান কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৩-৭৮ সালের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বেগবান করার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সরকারিভাবে এ দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিল প্রথম পদক্ষেপ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে প্রথম জাতীয় জনসংখ্যানীতি প্রণয়ন করা হয়। পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করে ২৫টি মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করে ২০১২ সালে পরবর্তী জনসংখ্যানীতি প্রণীত হয়। বর্তমানে এ নীতির আলোকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান।
