এপ্রিল ২৮, ২০২৩, ১১:৪৮ পিএম
- ২০৫০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব এতে প্রতি বছর মাথাপিছু সাশ্রয় হবে দুই হাজার টাকা : গবেষণা
এক যুগ লেগে গেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভালো ধারণা ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে
—অধ্যাপক সাইফুল হক
পরিচালক, শক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণায় বরাদ্দ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও প্রণোদনা বাড়ানোর বিকল্প নেই
—প্রকৌশলী মওদুদ রহমান
জ্বালানি প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বেড়েছে জ্বালানির দাম। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তবে সব ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের মধ্যে সৌরশক্তি সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে দেশেও নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ তৈরি করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। আর যদি সরকারের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোই উদ্দেশ্য থাকে তাহলে সাশ্রয়ী বিদ্যুতের পথ বন্ধ হবে। তারা বলছেন, উচ্চমূল্যের কয়লা, ফার্নেস ওয়েল কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে সরকারের আগ্রহ বেশি। কম দামের সৌর, বায়ু আর বর্জ্যবিদ্যুতের প্রকল্পগুলোর কাজ জোরদার করতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।
দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪.৫ কিলোওয়াট আওয়ার/বর্গমিটার সৌর বিকিরণ লাভ করে। বায়ু বিদ্যুতের জন্য সম্ভাবনা এখানো গবেষণাধীন। বর্তমানে ১৩টি স্থান থেকে বাতাসের উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনডিপির অর্থায়নে স্রেপজেন প্রকল্প থেকে বায়োমাস রিসোর্স ম্যাপিং সমীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সমীক্ষার পর দেশে বায়োমাসের সম্ভাবনার ওপর একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। বায়োমাস হলো মূলত জৈবপদার্থ, যাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। সৌরশক্তির একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ, যা সবুজ গাছপালা দ্বারা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং বায়োমাসরূপে গাছপালার বিভিন্ন অংশে মজুত থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই এমন জায়গাগুলোতে জনসাধারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। রান্নার জন্য বায়োমাস ও শস্য এবং কাপড় শুকানোর জন্য সৌরশক্তি এবং বায়ু ব্যবহার একটি ঐতিহ্যবাহী উপায় যাতে হাজার হাজার বছর ধরে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহূত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণির নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহূত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পানি বিদ্যুৎ, সোলার পিভি ব্যবহার করে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ, পৌর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গোবর ও পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস, বাতাসের গতি, ধানের তুস ও আখের ছোবড়া, বর্জ্য, শিল্প প্রক্রিয়ার অব্যবহূত তাপ থেকে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি উৎপাদন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে যা চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর উপর দেশের প্রথম পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে ১৯৫৭ সালে শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের অক্টোবর মাসে এই কেন্দ্রে ৫০ মেগাওয়াট কাপলান টাইপের টার্বাইনসম্বলিত চতুর্থ এবং পঞ্চম ইউনিট স্থাপন করা হয় যাতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটে প্রথম সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনে বেসরকারি উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে এবং ‘কস্ট বাই ডাউন’ সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রামীণ বাড়িগুলো এর আওতায় এসেছে। সোলার হোম সিস্টেমের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সরকারি কয়েকটি কর্মসূচি নিয়েছে। তার মধ্যে সৌর সেচ, সৌর মিনি/মাইক্রো গ্রিড, সোলার পার্ক, সোলার রুফটপ, সোলার বোটিং প্রভৃতি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে জিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া সরকার ভর্তুকি কমানোরও উদ্যোগ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ধরন এবং তাদের ক্রমবর্ধমান খরচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে তীব্রতর করেছে যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করার অন্যতম উপায়। এদিকে ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সর্বনিম্ন মূল্যে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে। সেখানে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ইউনিট সাড়ে তিন টাকারও কম মূল্যে উৎপাদিত হচ্ছে। বাঁধভিত্তিক জলবিদ্যুৎ ছাড়াই ভারতে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষমতা মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১৫ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৯০৯.১৯ মেগাওয়াট। যা সর্বমোট সক্ষমতার প্রায় ৩ শতাংশ। অনেক দেশ ব্যবহূত জ্বালানির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশে গত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় সাফল্য এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন একেবারেই সামান্য। বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশে (২৪৭০ মেগাওয়াট) পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতায় লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৯০৯.১৯ মেগাওয়াট, যা দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪ শতাংশেরও কিছু কম। এর মধ্যে শুধু সৌরশক্তি থেকেই উৎপাদন হচ্ছে ৬৭৫.২ মেগাওয়াট, যা মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৭৪ শতাংশ। এ ছাড়া হাইড্রো থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়ু থেকে আসছে ২.৯ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে আসছে দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট ও বায়োমাস থেকে আসছে দশমিক চার মেগাওয়াট। এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌর, বায়ু ও পানির মতো উৎসকে কাজে লাগিয়ে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়েই জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছে দেশটি।’ স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এ পর্যন্ত মোট ৪০টির অধিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই গৃহীত হয়েছে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৫ জেলায় স্থাপিত সোলার পার্ক থেকে মোট দুই হাজার ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় ৭.৪ মেগাওয়াট, পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আট, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ২০ ও জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার তিন মেগাওয়াট সক্ষমতার চারটি সোলার পার্কের কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে ময়মনসিংহে নির্মিত ৫০ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ, এখন পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম সোলার পার্কও এরই মধ্যে উৎপাদনে চলে এসেছে।
সদ্য প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব; আর তাতে করে প্রতি বছর মাথাপিছু সাশ্রয় হবে দুই হাজার টাকা। কিন্তু এই সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সর্বব্যাপী উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ার কারণ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে থাকার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বেশ সময় লেগেছে। ৩০ বছর আগে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ শুরু হলেও বাংলাদেশ এটি ২০০৮-১০ সালের দিকে শুরু হয়েছে। গত ১২ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভালো ধারণা ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সময় লেগে গেছে।’ জ্বালানি প্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষক প্রকৌশলী মওদুদ রহমান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম কম থাকায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ ছাড়া চলমান বিদ্যুৎ-সংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রসারে উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে গবেষণা বরাদ্দ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আর প্রণোদনা বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনী মূল অবকাঠামোয় বড় আকারে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।’
