মে ৪, ২০২৩, ০১:০২ এএম
দরিদ্র, মেধাবী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিনামূল্যে পাঠদান
- উপযুক্ত শিক্ষার্থী না পাওয়ার কথা বলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী না পাওয়ার দাবি সত্য নয়
—বিশ্বজিৎ চন্দ্র, সদস্য, ইউজিসি
দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। তবে শর্ত ছিল, ৩ শতাংশ দরিদ্র ও ৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা মিলিয়ে মোট ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে লেখাপড়ার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু কার্যক্রম চলমান ৯৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৩টি ইউজিসির এ আইন মানছে না। অথচ এমনও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যাদের কোটি কোটি টাকা উদ্বৃত্ত আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আমরা দরিদ্র মেধাবী ও মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষার্থী পাচ্ছি না। এ ব্যাপারে ইউজিসি জানিয়েছে, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী না পাওয়ার দাবি সত্য নয়। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পেতে সমস্যা হলে তাদের নাতি-নাতনিদের সুযোগ দেয়া যেত বা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বেশি সুযোগ দিতো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০, এর ধারা ৯ এর সনদপত্রের শর্তাবলীতে বলা হয়েছে, ‘ধারা ৭ এর অধীন সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই আইনের অধীন সনদপত্রের জন্য নিম্নবর্ণিত শর্তাবলী পূরণ করিতে হইবে, যথা:- (৪) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত পূর্ণকালীন শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম শতকরা ৬ তন্মধ্যে শতকরা ৩ ভাগ আসন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং শতকরা ৩ ভাগ আসন প্রত্যন্ত অনুন্নত অঞ্চলের মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য সংরক্ষণপূর্বক এ সব শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি, অন্যান্য ফি ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ প্রদান করিতে হইবে এবং প্রতি শিক্ষা বৎসরের অধ্যয়নরত এইরূপ শিক্ষার্থীর তালিকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে দাখিল করিতে হইবে।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্যক্রম চলমান ৯৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা তিন লাখ ১০ হাজারেরও বেশি, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বিনা খরচে পড়ার সুযোগ পেয়েছে এক হাজার ৬৮৮ জন। যা মোট শিক্ষার্থীর মাত্র দশমিক ৫৪ শতাংশ। এছাড়া দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেয়েছে ১০ হাজার ৫৬৯ জন। যা মোট শিক্ষার্থীর ৩ শতাংশের বেশি। সমন্বিত হিসাব করলে দেখা যায়, বিনা খরচে সর্বমোট প্রায় ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে ৮৩ বিশ্ববিদ্যালয় ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে পড়াতে পারেনি। এছাড়া একজনও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে বিনা খরচে পড়ায়নি ১৭ বিশ্ববিদ্যালয়। আর ২০ বিশ্ববিদ্যালয় একজনও দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীকে পড়ায়নি। এ ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, এ আইন মানার ব্যাপারে আমরা উদার। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী পাওয়ার জন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষার্থী পাচ্ছি না। আর এ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পাওয়া যাচ্ছে না। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট শিক্ষার্থী ১২ হাজার ১৯৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির উদ্বৃত্ত রয়েছে এক কোটি ১১ লাখ টাকা। কিন্তু তারা মাত্র সাতজন মুক্তিযোদ্ধা ও তিনজন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ দিয়েছে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শহিদুল হাসান আমার সংবাদকে বলেন, আমরা প্রতিবছর মুক্তিযোদ্ধা ও দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য বিজ্ঞপ্তি দেই। সবদিক বিবেচনা করে উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের আমরা সুযোগ দিয়ে থাকি। শুধু দরিদ্র শিক্ষার্থী হলেই তো হবে না তাদের মেধাবীও হতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না পেলে আমরা কী করব? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি তো আর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান না।
ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী এক হাজার ৩৮৯ জন। অথচ একজনও মুক্তিযোদ্ধা ও দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম আমার সংবাদকে বলেন, আমরা ইউজিসির আইন মেনে চলি। আমি কয়েকজনকে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ দিয়েছি। তবে ৬ শতাংশের জন্য আমাদের ভর্তির বিজ্ঞাপনে সেটি উল্লেখ করি। আমাদের বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে, মুক্তিযোদ্ধা ও দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে পড়ানো হয়। সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ৫০৯ জন। দুই জন মুক্তিযোদ্ধাকে সুযোগ দিলেও কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীকে পড়ার সুযোগ দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ বিষয়ে উপাচার্যকে কল দেয়া হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কল কেটে দেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র আমার সংবাদকে বলেন, কোটি কোটি টাকা আয় করেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন কিছু শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিচ্ছে না? এটা তো মানবিক বিষয়। এটার জন্য নির্দেশনা দিতে হবে কেন? এটা তো তারা এমনিতেই করতেই পারে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান না পেলে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের তারা সুযোগ দিতে পারে। এছাড়া দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী না পাওয়ার দাবি সত্য বলে মনে হয় না। এখনো অনেক শিক্ষার্থী আছে, সুযোগের অভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিবেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ব্যাপারে আমরা দিক নির্দেশনা দিয়েছি। প্রয়োজনে আবার দিব।
