সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া
অক্টোবর ১০, ২০২৩, ১২:১২ এএম
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষায় প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রয়াস
—তানসেন রোজ, প্রতিষ্ঠাতা, আঁচল ফাউন্ডেশন
দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন রয়ে গেছে, এ সেবার
ব্যাপক প্রচার ও প্রসার প্রয়োজন
—অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন, মনোবিজ্ঞানী
রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে দিবা রায়। তার মায়ের সাথে বসে আছে শান্তিনগর একজন মানসিক ডাক্তারের চেম্বারের সামনে। দিবা এখানে এই প্রথম নয়, এর আগেও এসেছে তিনবার। দিবা রায়ের মা সুস্মিতা রায়ের সাথে কথা বলতেই জানা গেল দিবার সমস্যা সম্পর্কে। তিনি জানালেন, দিবার ঘুম হয় না অনেক দিন থেকে। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। খাওয়া-দাওয়া কমে গেছে, স্কুলেও যেতে চায় না। তাকে বিভিন্ন ডাক্তার দেখিয়েছেন তারা। সর্বশেষ এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে নিতে এসেছেন মানসিক ডাক্তারের চেম্বারে।
ঢাকা মানসিক হাসপাতালে ছেলেকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে এসেছেন টাঙ্গাইলের মোজাম্মেল হক। তার ২১ বছর বয়সি ছেলে আবিরের হাত দুটো বাঁধা। মোজাম্মেল হকের সাথে কথা বলতেই জানা গেল তার ছেলের সমস্যা সম্পর্কে। তিনি বলেন, তার ছেলে মোবাইলে গেমস খেলত। এক ধরনের নেশা হয়ে গেছে। পড়াশোনা না করায় মোবাইল কেড়ে নেয়া হয় তার কাছ থেকে। সে ঘরের নানা জিনিসপত্র ভাঙচুর করত। হাত দিয়ে মাথার চুল টানতে থাকে। রাগে ক্ষোভে কেমন করে উঠে। হাতের কাছে যা পায় সব ছুড়ে মারে। এখানে চিকিৎসা নিচ্ছি দুই মাস হলো। আগের চেয়ে কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে এখন। মানসিক হাসপাতালের তৃতীয় তলার বারান্দায় বসে আছেন নিশাত আরা বেগম ও তার ১৫ বছর বয়সি মেয়ে তিশা। তিশা পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। তার কোনো কিছুই ভালো লাগে না। রাতে ঘুম হয় না। এমন সব মানসিক সমস্যা থেকে তিনি তার মেয়েকে নিয়ে এখানে চিকিৎসা করাচ্ছেন।
কিছু দিন আগে আত্মহত্যা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম। তিনি সুইসাইড নোটে লিখে যান, ‘চোরাবালির মতো ডিপ্রেশন বেড়েই চলছে। মুক্তির পথ নেই, গ্রাস করে নিচ্ছে জীবন; মেনে নিতে পারছি না।’ তার সহপাঠীরা জানায়, পারিবারিক ও মানসিক চাপ থেকেই তার এই আত্মহননের পথ বেছে নেয়া।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। এই আত্মহত্যার বড় একটি কারণ বিষণ্নতা এবং অত্যধিক আবেগ, যা মানসিক অসুস্থতার প্রমাণ বহন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের ১০টি রোগের মধ্যে ওসিডির অবস্থান তৃতীয়। ওসিডি নানা রকম হতে পারে। একই কাজ বারবার করতে থাকা, অস্থিরতা, যেকোনো বিষয় নিয়ে প্রবল উদ্বেগ, ডিপ্রেশন এই রোগের অন্যতম উপসর্গ। ওসিডি মানুষকে এতটাই যন্ত্রণা দেয় যে, তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। প্রতিদিনের জাপিত জীবন বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ ও বিষাদ। দীর্ঘদিন মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দীন। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি ও সমস্যা নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন তার সাথে।
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়টি এখনো অনেকটা উপেক্ষিত। এ দেশগুলোতে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তেমন জ্ঞান থাকে না। মানসিক সমস্যাগুলো এখনো কুসংস্কারছন্ন হয়ে আছে। সামপ্রতিক সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে , তবে তা পর্যাপ্ত নয়। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে বুঝাতে হবে মানসিক প্রতিবন্ধকতা কী ও কেন হয়। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে মানসিক বিষণ্নতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনের বেশি সময় এসব ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না। এতে মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে কাজ করে আঁচল ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনটির তথ্য বলছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪০৫ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মানসিক সমস্যা, হতাশা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি অন্যতম।
ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠাতা, তানসেন রোজ আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, সময়ের সাথে মানুষের মানসিক চাপ বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তারা পরিবারের কাছে তাদের মনের কথা বলার মতো পরিবেশ পাচ্ছে না। পরিবার অনেক সময় তাদের কাছে প্রতিপক্ষ মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা আরও বেশি হতাশ হয়ে পড়ে। পরিবার তাদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। তা ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্র আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহনশীল আচরণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে প্রচার প্রসারের উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার দূর করা ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ওয়ার্ল্ভ্র ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ ১৯৯২ সাল থেকে ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন কর্মসূচি শুরু করে।