অক্টোবর ১৩, ২০২৩, ১২:২৪ এএম
ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অব্যাহত অনিয়ম দুর্নীতির ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। হুঙ্কার ছেড়েও খেলাপি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ আর নীতি সুবিধা দিয়েই ক্ষান্ত থাকছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তাই কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এক বছর আগেও এ হার ছিল ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণ করা ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ২৮ টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২৮ শতাংশ। তিন মাস আগে এ অঙ্ক ছিল ১৭ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে দুই হাজার ৯৬ কোটি টাকা। আর ছয় মাসে বেড়েছে তিন হাজার ১৩০ কোটি টাকা। কারণ চলতি বছরের শুরুতে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপির অংক ছিল ১৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত এক বছরে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে চার হাজার ১৫ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণের স্থিতি ছিল ৭২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যা তিন মাস আগে মার্চ শেষে ছিল ৭১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ৮৮৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচিত সময়ে ঋণের চেয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে অত্যধিক হারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের জের এখনো টানছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তার মালিকানা আছে এমন চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উঁচু। আবার তার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অন্য প্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ। এর প্রতিফলন দেখা গেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের সার্বিক চিত্রে। লতি প্রান্তিকের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য জানা যায়নি। খেলাপির হার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় তথ্য আড়াল করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে গত মার্চ প্রান্তিকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা গেছে, বছরের প্রান্তিকে দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৬টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর মধ্যে ১৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি। এদের মধ্যে ছয়টির অবস্থা বেশ নাজুক। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৮০ থেকে ৯৯ দশমিক ৬২ শতাংশ পর্যন্ত।
গত প্রান্তিকে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি ছিল সেগুলো হলো— পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড ও ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠানে মালিকানা আছে পি কে হালদারের। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ টাকা তিনি নামে-বেনামে তুলে নিয়েছেন, যা এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
পি কে হালদার ছিলেন আভিভা ফাইন্যান্স (সাবেক রিলায়েন্স ফাইন্যান্স) ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই দুটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন। পি কে হালদার এই পদে থেকেই অন্য চার প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী ভূমিকা থাকা দরকার। বর্তমানে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনজক হারে বাড়ছে। অপরাধীদের শাস্তি হলে পরিস্থিতি আরও ভালো থাকত।
