ডিসেম্বর ৩১, ২০২৩, ১২:১৯ এএম
- মাসে দু-চার দিন উপস্থিতি থাকলেও বিশেষ দিবসেও থাকেন অনুপস্থিত
- শিক্ষার্থী ভর্তির সময় বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ
- প্যারালাইজড অ্যাকাউন্টেন্টসের প্রক্সি পালনে বাড়তি খরচ, ঘটেছে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাও
- হয় না দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস, তবুও মাসিক খরচ পাঁচ-সাত লাখ টাকা
সাতটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সাতটি টেক্সটাইল ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ও ৪১টি ভোকেশনাল টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে বস্ত্রশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বস্ত্রশিল্পের পোষক কর্তৃপক্ষ- বস্ত্র অধিদপ্তর। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় ভোকেশনাল টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট একটি। বস্ত্র খাতে সরকারের অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেও দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে বলেই জানে সবাই। প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটিতে নানা অনিয়মের কারণে এখন দক্ষ জনবল তৈরির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব পালন কিংবা শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা ও তদারকি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। নিজের খেয়ালখুশি মতো অফিস করছেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান— সুপারিনটেনডেন্ট। দায়িত্ব পালন বাদ দিয়ে অধিকাংশ সময়ই যিনি রহস্যজনক দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত থাকেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর ও বোর্ডে। খোদ প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই বলছেন, মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরের কাজে ব্যস্ত থাকেন তিনি। তাই দু-চার দিন অনুপস্থিত থাকতে হয়। এ ছাড়া আরও একাধিক অনিয়ম ঘটেছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
জানা গেছে, মাসে বড়জোর এক থেকে দুদিন প্রতিষ্ঠানে আসেন সুপারিনটেনডেন্ট এ কে এম মনজুরুল হক। বাকি দিনগুলোতে ব্যস্ত থাকেন নিজের ব্যক্তিগত কাজে অথবা মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরে কোনো তদবিরে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস পালন করা হলেও প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি, সর্বশেষ গেল ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের প্রোগ্রামেও। শুধু কি তাই, ছিলেন না সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানেও। বিশেষ বিশেষ দিন ছাড়াও অনুপস্থিত থাকাই যেন নিয়মে পরিণত করেছেন তিনি। তবুও তার দৈনিক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর হচ্ছে নিয়মিত।
অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে হাজিরা খাতায় নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করছেন তা জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বিভিন্ন কাজ থাকে, বোর্ডে কাজ থাকে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে বিভিন্ন কাজ সামলাতে হয় তাকে। এ ছাড়া ডিপ্লোমা সিলেবাস কমিটিতেও রয়েছেন তিনি। যে কারণে যেতে হয়। এ ছাড়া ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রোগ্রামে তিনি উপস্থিত ছিলেন দাবি করে জানান, ছবি তোলা আছে সেদিনের।’ যদিও প্রতিষ্ঠানটির একটি সূত্র জানিয়েছে, সেদিন প্রোগ্রামে আসেননি তিনি। তবে মাঝে মধ্যে এলেও কিছু সময় উপস্থিত থেকে আবার চলে যান। যেটুকু সময় উপস্থিত থাকেন তার মধ্যে সুযোগ বুঝে ছবি তুলে রাখেন উপস্থিতি প্রমাণের জন্য। এ ছাড়া বাচ্চা অসুস্থ থাকায় সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি তিনি। তবে বিদায় অনুষ্ঠানেও এসেছিলেন বলে জানান সুপার মঞ্জুরুল হক। যদিও প্রতিষ্ঠান সূত্র বলছে, সেদিনও আসেননি তিনি।
এদিকে তার অনুপস্থিতি আর অনিয়ম জেঁকে বসেছে প্রতিষ্ঠানটির অন্যসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও। সূত্র জানায়, চলমান ভেকেশনেও বেশির ভাগ সময় অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। চলমান ভেকেশন ও এর আগে একাধিকবার সরেজমিন গিয়েও তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। অথচ ভেকেশনেও সুপারিনটেনডেন্ট, অ্যাকাউন্টেন্টস, অফিস সহকারীদের প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠান সূত্র। সব নিয়মকেই এড়িয়ে চলা এই সুপারিনটেন্ডেন্টের আশকারায় অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রভাষক (ভাষা) খলিল মিয়াও। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে যিনি নির্ধারিত ফির চেয়েও বাড়তি টাকা আদায় করছেন বলে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়াও ব্যাচভিত্তিক প্রাইভেট টিউশনির নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু দুই-তিন হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি। শুধু তাই নয়, ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ফরম পূরণের নামেও বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে খলিলের বিরুদ্ধে। অথচ নিজের সব অনিয়মের চাউর ঠেকাতেই অন্যদের অনিয়মকেও প্রশ্রয় দিচ্ছেন সুপারিনটেনডেন্ট মঞ্জুরুল হক। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে এসবের কোনোরকম তদারকিই করেন না তিনি। সূত্রের দাবি, তদারকি করবেন কীভাবে; মাসের প্রায় পুরো সময়টাই তিনি ব্যস্ত থাকেন নিজের কাজে।
তবে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বাড়তি টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আমার সংবাদকে সুপারিনটেনডেন্ট বলেন, ‘এটি ঠিক না। কেউই বাড়তি টাকা নিতে পারবে না। সেই নির্দেশনা দেয়া আছে। একটি টাকাও বাড়তি নেয়া হয় না। এ ছাড়া রিসিট বই করা আছে।’ তবে তিনি বলেন, ‘আগে নেয়া হতো। আগে আড়াই-তিন হাজার টাকা নেয়া হতো। এখন নেয়া হয় না।’ নিয়মিত ক্লাসের বাইরেও কোচিং করানোর নামে শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব আগে হলেও এখন বন্ধ করে দিয়েছি। কোচিং করানোর কোনো সুযোগ নেই। এখানকার শিক্ষার্থীরা গরিব পরিবারের। সাতজন শিক্ষার্থী টাকার অভাবে ফরম পূরণ করতে পারছিল না।’ তাদের ফরম পূরণের টাকাও তিনি দিয়েছেন বলে জানান। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের চেষ্টা করছেন তিনি। এ জন্য একটি আবেদনও করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে স্ট্রোকজনিত কারণে ডান হাত প্যারালাইজড হওয়ার পরও সাত বছর ধরে রহস্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টেন্টস সোহেল রানার ঘানিও টানছে সরকার। অথচ প্যারালাইজড হওয়ার পর থেকেই ডান হাতে কোনো কাজই করতে পারেন না তিনি। বাম হাত দিয়ে কোনোভাবে ঠেলেঠুলে নিজের স্বাক্ষর দিতে পারলেও অফিসিয়ালি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হচ্ছে মূলত প্রক্সি দায়িত্বের মাধ্যমে। তার কাজের প্রক্সি দিতে অপর একজন অ্যাকাউন্টেন্টসও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সেখানে। প্রক্সি দেয়া সেই অ্যাকাউন্টেন্টস প্রতিষ্ঠানটির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও আত্মসাৎ করে বর্তমানে জেলে রয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
৩৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হলেও সূত্র বলছে, কমার্স ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ২২ লাখ টাকা উদ্ধারও করা হয়েছে। যে কারণে অধিদপ্তর থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। এরপর একইভাবে সোহেলের দায়িত্বের প্রক্সি দিতে বর্তমানে কুমিল্লা থেকে আরও একজন অ্যাকাউন্টেন্টসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যিনি সপ্তাহে দুদিন কুমিল্লা থেকে এসে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়ের এই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রক্সি দায়িত্ব পালন করছেন। এতে সরকারের যেমন মাসিক ২০-৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তেমনি নিয়মেরও ব্যত্যয় ঘটছে। যদিও রহস্যজনক কারণে সোহেল রানাকে অবসর না দিয়ে উল্টো সরকারের টাকা খসানো হচ্ছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অ্যাকাউন্টেন্টস সোহেল রানার বিষয়ে সুপারিনটেনডেন্ট বলেন, ‘এটি অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত। তার প্রক্সি হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করছেন তাও অধিদপ্তরের আদেশে করছেন। এখানে আমার কিছু বলার নেই।’ এ ছাড়াও সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় শিফটেও কোনো ক্লাস না করেই (ক্লাস হলেও তা মাঝে মধ্যে) ভাতা নিচ্ছে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ক্ষেত্রেও সরকারের মাসিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় পাঁচ-সাত লাখ টাকা। সার্বিক বিষয়ে বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নুরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চেয়ে ফোন করা হলেও তিনি অসুস্থ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে পরিচালক (প্রশাসন) দেওয়ান মো. আব্দুস সামাদকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করেই কেটে দেন।
