ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

রপ্তানি সংকটে বস্ত্র খাত

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১০:০৯ এএম

রপ্তানি সংকটে বস্ত্র খাত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাত আবারও বড় সংকটের মুখে পড়েছে। সামপ্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। এর ফলে বস্ত্র খাতের সঙ্গে যুক্ত কোটি কোটি কর্মী ও ব্যবসায়ীর জীবন ও আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, কাঁচামালের দামের উর্ধ্বগতি এবং ক্রেতাদের অস্থিতিশীল চাহিদার কারণে এই পতন আরও প্রকট হয়েছে।

খাতটির আয়ের প্রধান অংশই আসে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। কিন্তু যেসব দেশ যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তারা চাহিদা কমিয়েছে, ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যেও প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, আগের মতো বড় অর্ডার পাচ্ছেন না, আর যেগুলি পাচ্ছেন, সেগুলোর দাম কমছে। ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্পীদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কর্মীদের বেতন, সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি অবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু পোশাক খাত নয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার, শিল্পী সংগঠন এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি, যাতে বস্ত্র খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায় এবং দেশের অর্থনীতি ধ্বসে না যায়।  মার্চে রপ্তানি আয় হয়েছে ২৭৮ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের ৩৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের তুলনায় ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার কম। একক মাসে ১৯.৩৫ শতাংশ হ্রাস হলো দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে।

নিট ও ওভেন পোশাকে ক্ষতি : তথ্য অনুযায়ী, দুইধরনের পোশাক নিট এবং ওভেন উভয়েই উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে।

  • নিট পোশাক: রপ্তানি কমেছে ২১.২০ শতাংশ
  • ওভেন পোশাক: রপ্তানি কমেছে ১৭.৩২ শতাংশ

এই পতনের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে ৫.৫১ শতাংশে, অর্থাৎ ২,৮৫৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ৩,০২৪ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার।

বহুমুখী সমস্যা ও যুদ্ধের প্রভাব : বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “রপ্তানির হ্রাসের পেছনে বহুমুখী সমস্যা কাজ করেছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রভাব এসেছে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতার কারণে।”

তিনি জানান, চলমান যুদ্ধ-বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরান, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত  তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। “ইউরোপের বাজার দীর্ঘ সময় ধরে মন্দার মধ্যে আছে। নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ক্রেতারা অতি হিসাব-নিকাশ করছে এবং কার্যাদেশ কম দিচ্ছে।”

মহিউদ্দিন রুবেল উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালীতে সংকটও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিতিশীলতা পোশাক শিল্পের খরচ এবং ডেলিভারি সময়কে প্রভাবিত করছে।

মার্চ মাসে রপ্তানি হ্রাসের অন্যান্য কারণ

মার্চে রপ্তানি আয় হ্রাসের পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে,

  • ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা: প্রধান বাজারে ক্রেতাদের কার্যাদেশ কমে গেছে।
  • ঈদের দীর্ঘ ছুটি: মার্চে আটদিনের লম্বা ছুটি বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
  • সাপ্লাই চেইনের অস্থিরতা: আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ডেলিভারি সময় বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • সঙ্কুচিত ক্রয় ক্ষমতা: ক্রেতারা অগ্রিম অর্ডার কমাচ্ছে এবং পূর্বের স্টক শেষ করার চেষ্টা করছে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে মার্চে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা রপ্তানির জন্য চ্যালেঞ্জিং।”

চলতি অর্থবছরের রপ্তানি প্রবণতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রপ্তানি হ্রাসের ধারা নিম্নরূপ:

  • আগস্ট: ৪.৭৫% কম
  • সেপ্টেম্বর: ৫.৬৬% কম
  • অক্টোবর: ৪.৩৯% কম
  • নভেম্বর: ৫% কম
  • ডিসেম্বর: ১৪.২৩% কম
  • জানুয়ারি: ১.৩৫% কম
  • ফেব্রুয়ারি: ১৩.২১% কম

রপ্তানি হ্রাসের ধারা দীর্ঘমেয়াদি, যা ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আগামী মাসেও থাকবে।

ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজার ইউরোপ।

  • ক্রেতারা অর্ডার কমাচ্ছে
  • পূর্বের স্টক শেষ করার চেষ্টা করছে
  • অস্থির বাজারের কারণে নতুন অর্ডার দিতে দেরি হচ্ছে

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “ইউরোপে সংকট দীর্ঘস্থায়ী। কিছু সময় বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও স্থিতিশীলতা ভেঙে দিচ্ছে।”

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী

হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

  • জ্বালানি খাতে অস্থিরতা পোশাক রপ্তানিতে খরচ বৃদ্ধি করেছে
  • পরিবহন ব্যয় বেড়েছে
  • ডেলিভারি সময় বাড়িয়েছে

বিজিএমইএ-এর একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন:

  • যুদ্ধ এবং মন্দা একসাথে রপ্তানি আয় হ্রাস করেছে
  • ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত বা কমিয়েছে
  • শিল্প কারখানার উৎপাদন কমে গেছে

সরকার রপ্তানি খাতকে সহায়তা করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:

  • অর্থনৈতিক উদ্দীপনা: রপ্তানিকারকদের জন্য ভর্তুকি এবং ঋণ সুবিধা
  • সাপ্লাই চেইন সুবিধা: শুল্ক, পরিবহন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা
  • বাজার গবেষণা: ইউরোপ ও মার্কিন বাজারে ক্রেতার চাহিদা নিরীক্ষণ
  • উৎপাদন সহায়তা: প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি

মন্ত্রীরা আশা করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে পুনরায় স্থিতিশীল হবে।

শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ : বৃহৎ যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক মন্দা থাকলেও বাংলাদেশি তৈরি পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে।

  • শ্রম খরচ কম হওয়া, দক্ষ শ্রমিক সংখ্যা প্রাচুর্য
  • বৈশ্বিক ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা
  • নতুন বাজারের সন্ধান, যেমন দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা

বিজিএমইএ এবং শিল্প নেতারা মনে করেন, ‘যুদ্ধের পরে স্থিতিশীল বাজারে রপ্তানি পুনরায় বৃদ্ধি পাবে, তবে এর জন্য কিছু সময় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন।’

সর্বোপরি, বর্তমান বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের বস্ত্র খাতকে কঠিন সময়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রপ্তানির হ্রাস শুধু অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে না, বরং কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের জীবনমানেও ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ধ্বংসের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই খাতের টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় সমন্বয়, বাজার বিস্তারের নতুন উদ্যোগ এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। অন্যথায়, দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়বে।

Link copied!