ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

শতকোটির ‘ভুতুড়ে’ স্টেশন

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১২:২৪ এএম

শতকোটির ‘ভুতুড়ে’ স্টেশন

আধুনিক নির্মাণশৈলী, কাচঘেরা ভবন, আর উন্নত বিশ্বের আদলে গড়া প্ল্যাটফর্ম দূর থেকে দেখলে মনে হবে ইউরোপের কোনো ব্যস্ত রেলওয়ে জংশন। কিন্তু কাছে গেলেই ভুল ভাঙে। জনমানবহীন প্ল্যাটফর্ম আর ধুলো জমা টিকিটের কাউন্টার জানান দেয়, ১০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এখন কেবলই একটি সুদৃশ্য ‘শো-পিস’। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশনটি এখন অপরিকল্পিত উন্নয়নের এক জীবন্ত স্মারক।

লক্ষ্য ছিল হাজারো যাত্রী, বাস্তবে কেবল ‘টিকটক স্পট’ : ২০১৯ সালে যখন এই স্টেশনের উদ্বোধন করা হয়, তখন রেল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। ধারণা করা হয়েছিল— গাজীপুর, টঙ্গী এবং সাভার শিল্পাঞ্চলের অন্তত ১০-১৫ হাজার যাত্রী প্রতিদিন এখান থেকে যাতায়াত করবেন। কালিয়াকৈর হাইটেক সিটিতে কর্মরত আইটি পেশাজীবীদের জন্য এটি হবে প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। উত্তরবঙ্গের ট্রেনগুলোর একটি বড় হাব হিসেবে এটি ব্যবহূত হবে। বাস্তব চিত্র— উদ্বোধনের ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সারাদিনে এই স্টেশনে থামে মাত্র একটি ট্রেন। সারা দিনের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ২২টি টিকিট। ফলে সাধারণ যাত্রীরা স্টেশনে এসে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বর্তমানে স্টেশনের মূল ব্যবহারকারী হলো স্থানীয় কিশোর-কিশোরীরা, যারা বিকেলে এখানে এসে টিকটক ভিডিও বানায় বা আড্ডা দেয়।

রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বনাম আয় : স্টেশনটি সচল রাখতে মাসিক যে খরচ হয়, তার বিপরীতে আয় প্রায় শূন্য। পরিচালন ব্যয়: মাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা (বিদ্যুৎ বিল, পরিচ্ছন্নতা এবং জনবল বাবদ)। আয়ের উৎস: দিনে মাত্র ২২টি টিকিটের নামমাত্র মূল্য।

কাজে না আসায় স্টেশনের অত্যাধুনিক ভিআইপি বিশ্রামাগার, রিলে রুম এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে এখন রেলের মাঠকর্মীরা বসবাস করছেন। কোটি টাকার সিগন্যালিং যন্ত্রপাতি অলস পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

নকশার ভুল, কেন থামছে না ট্রেন : এত টাকা ব্যয়ের পর কেন ট্রেন থামানো যাচ্ছে না, তার এক অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের মতে, এখানে মারাত্মক কারিগরি ও অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে— ১. ক্লিয়ারিং স্ট্যান্ডিং লেংথ সংকট: ঢাকা অভিমুখী প্ল্যাটফর্মের ঠিক পাশেই একটি লেভেল ক্রসিং গেট রয়েছে। ২. ভৌগোলিক বাধা: টাঙ্গাইল প্রান্তে রয়েছে একটি ছোট ব্রিজ। ৩. ফলাফল: এই দুই বাধার কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রেন দাঁড়ানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা (লুপ লাইন বা প্ল্যাটফর্ম দৈর্ঘ্য) সেখানে নেই। ট্রেন দাঁড়ালে লেভেল ক্রসিং বন্ধ হয়ে যায় অথবা ব্রিজের ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়। অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান (যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ) বলেন, ‘একটি আধুনিক স্টেশন নির্মাণের আগে কেন এই সামান্য প্রকৌশলগত দিকগুলো বিবেচনা করা হলো না, তা এখন বড় প্রশ্ন।’

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও রেলের সামগ্রিক দশা : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয়। যেখানে সারা দেশে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ১৩০টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ হয়ে আছে এবং গত ১২ বছর শতাধিক লোকাল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ হয়েছে, সেখানে এমন ‘বিলাসিতা’ অর্থহীন। বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন— অপরিকল্পিত প্রকল্প: যাত্রী চাহিদার চেয়ে চাকচিক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জবাবদিহিতার অভাব: যারা এই ভুল নকশা অনুমোদন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর্থিক ক্ষতি: ঋণ নিয়ে করা এসব প্রকল্প রেলওয়েকে আরও বেশি দেনার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এলাকাবাসীর আর্তনাদ : স্থানীয় এক পোশাক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের ট্যাক্সের টাকায় এত সুন্দর স্টেশন বানালো, অথচ আমরা ঢাকায় যাওয়ার জন্য ট্রেন পাই না। বাসে করে যানজটে আটকে যেতে হয়, আর এই স্টেশনটা খালি পড়ে থাকে। এটা দেখার কেউ নেই’।

উল্লেখ্য, গাজীপুরের হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশনটি বাংলাদেশের রেল খাতের অব্যবস্থাপনার এক প্রতীকী চিত্র। যদি দ্রুত অবকাঠামোগত ত্রুটি সংশোধন করে অধিকসংখ্যক ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা না করা হয়, তবে অচিরেই এই শত কোটি টাকার স্থাপনাটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।

Link copied!