ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ভুল নীতিতে ধুঁকছে চা শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন ১৫, ২০২৬, ১২:১৮ এএম

ভুল নীতিতে ধুঁকছে চা শিল্প

বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় ও দীর্ঘ। এক সময় পাট ও চামড়ার পাশাপাশি চা ছিল এ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত। কিন্তু বিগত দুই দশকের ব্যবধানে দেশের চা খাতের ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যে চা এক সময় বিশ্ববাজারে দেশের সুনাম বয়ে আনত, তা এখন নিজস্ব সীমানার ভেতরেই বন্দি হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে চায়ের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও রপ্তানির গ্রাফ নেমে এসেছে তলানিতে।

দুই দশক আগেও যেখানে উৎপাদিত চায়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে রপ্তানি হতো, আজ তা মোট উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশের ঘরে এসে ঠেকেছে। মূলত ত্রুটিপূর্ণ রপ্তানি প্রণোদনা নীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের পাহাড় জমছে, যা সামাল দিতে সরকারকে কৃত্রিম ও সাময়িক নানা পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

চা বোর্ড এবং চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চায়ের উৎপাদন এবং রপ্তানির মধ্যে একটি বিশাল অমিল বা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। বিগত ২৫ বছরের উৎপাদন ও রপ্তানির একটি তুলনামূলক খতিয়ান দেয়া হলো-

সোনালী যুগের পরিসংখ্যান (২০০১-২০০৫)

২০০১ সাল: এই বছর দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি। এর বিপরীতে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার কেজি (উৎপাদনের প্রায় ২৪%)। ২০০২ সাল: রপ্তানি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার কেজিতে। ২০০৩ সাল: রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার কেজি। ২০০৪ সাল: বিদেশে পাঠানো হয় ১ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার কেজি চা। ২০০৫ সাল: রপ্তানি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯০ লাখ ১ হাজার কেজিতে।

বিগত দেড় দশকে আধুনিক চাষাবাদ ও বাগান সমপ্রসারণের ফলে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হলেও রপ্তানির চিত্র অত্যন্ত করুণ-

২০২১ সাল: এই বছর রেকর্ড ৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের বিপরীতে রপ্তানি হয় মাত্র ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি। ২০২২ সাল: ৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে রপ্তানি হয় মাত্র ৭ লাখ ৮০ হাজার কেজি। ২০২৩ সাল: এই বছর দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১০ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি চা উৎপাদন করে রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু এত বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে রপ্তানি দাঁড়ায় মাত্র ১০ লাখ ৪ হাজার কেজিতে (মাত্র ১ শতাংশ)। ২০২৪ সাল: রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজিতে পৌঁছালেও তা স্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সাল: সর্বশেষ সমাপ্ত বছরে উৎপাদন ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি হলেও রপ্তানি আবার কমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে নেমে আসে। চা রপ্তানি কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সরকারের রপ্তানি প্রণোদনা নীতির একটি বিতর্কিত শর্তকে।

রপ্তানি বাড়াতে সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে চায়ের ওপর ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা চালু করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরে আরও কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। নগদ প্রণোদনা ২ শতাংশে নামানোর চেয়েও বড় ধাক্কা এসেছে এর নীতিমালায় থাকা একটি বিশেষ শর্তের কারণে। বর্তমান নীতি অনুযায়ী, চা রপ্তানিতে প্রণোদনা পেতে হলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই নিজস্ব চা বাগানের মালিক হতে হবে। বাস্তব চিত্র হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ চা উৎপাদনকারী বাগানের নিজস্ব কোনো ব্র্যান্ড বা আন্তর্জাতিক বিপণন ব্যবস্থা নেই। তারা মূলত পাতা উৎপাদন করে এবং তা নিলামে বিক্রি করে দেয়।

অন্যদিকে, দেশের বড় বড় করপোরেট ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো নিলাম থেকে চা কিনে নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাজারজাত ও রপ্তানি করে। এই শর্তের কারণে দেশের বেশিরভাগ সম্ভাব্য ও সক্ষম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বাগান মালিকদের মধ্যে মাত্র সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্র্যান্ড রয়েছে। ফলে বড় করপোরেট হাউসগুলো রপ্তানি করতে চাইলেও কোনো সরকারি সুবিধা পাচ্ছে না, যা তাদের চা রপ্তানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে।

বিশ্ব মহামারি কোভিড-১৯ এর পর থেকে টানা কয়েক বছর ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের চা বাজারে এক ধরনের মন্দা ভাব তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওঠানামার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদকরা অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে চা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। চা খাতকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সরকার বাধ্য হয়ে নিলামে চায়ের ‘ফ্লোর প্রাইস’ বা সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা মুক্ত বাজার অর্থনীতির পরিপন্থী এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

দেশীয় চা শিল্পকে বিদেশি চায়ের আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা দিতে ২০১২ সালে প্রথম নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) আরোপ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা আরও ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে চা আমদানির ওপর সর্বমোট ৮৯.৩২ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। এই উচ্চ শুল্কের কারণে বিদেশি চায়ের আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ ও আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের মধ্যে কোনো ভারসাম্য তৈরি করতে পারেনি। অর্থাৎ, আমদানি বন্ধ হলেও রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি।

চা খাতের আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না আসার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। বাংলাদেশে চায়ের ‘উৎপাদন’ কার্যক্রম পরিচালিত হয় কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতায় (চা বোর্ডের মাধ্যমে), অন্যদিকে এর ‘বিপণন ও বাণিজ্য’ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের এই দ্বিমুখী নিয়ন্ত্রণের কারণে চা খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, জমি লিজ নবায়ন এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হন। ফলে এই শিল্পে প্রয়োজনীয় নতুন বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি এবং রপ্তানি বাজারের মন্দা দশা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। তিনি বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেন, ‘দেশে চায়ের অভ্যন্তরীণ ভোগ বা ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আমরা উৎপাদন বাড়াতে পেরেছি, কিন্তু তার বেশিরভাগই দেশের ভেতরের বাজারে ব্যবহূত হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো দেশগুলো আমাদের চেয়ে অনেক কম খরচে চা উৎপাদন করতে পারে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।’

বাংলাদেশের চা শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে একটি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়, যদি না তার জন্য একটি উন্মুক্ত ও লাভজনক বাজার তৈরি করা যায়। অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম ব্যবস্থা থেকে এই খাতকে মুক্ত করতে রপ্তানি বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

Link copied!