ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

বক্স কালভার্টের মরণফাঁদে ঢাকা

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৩:০২ এএম

বক্স কালভার্টের মরণফাঁদে ঢাকা

আশি থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত রাজধানীকে দ্রুতগতির ও যানজটমুক্ত করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের মূল ধমনি হিসেবে পরিচিত উন্মুক্ত খালগুলোকে উদ্ধার বা সংরক্ষণ না করে, সেগুলোর ওপর বসানো হয়েছিল কংক্রিটের কঠিন ঢাকনা যা আজ ‘বক্স কালভার্ট’ নামে এক আত্মঘাতী মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

পান্থপথ ও সেগুনবাগিচা খালের ওপর নির্মিত রাস্তাগুলো একসময় নগরায়ণের অনন্য সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও, মাটির নিচে আজ তা তৈরি করেছে অন্ধকার ও রুদ্ধ সুড়ঙ্গ। উন্মুক্ত পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব কালভার্টের ভেতরের অংশে বছরের পর বছর জমেছে কঠিন পলি, প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য। খোলা না থাকায় নিয়মিত পলি অপসারণ বা পরিষ্কার করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য মাঝারি বর্ষণেই শহরের অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ে এবং মিরপুর, ধানমন্ডি, কল্যাণপুর, খিলগাঁও, শান্তিনগর থেকে শুরু করে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা থইথই পানির নিচে তলিয়ে থাকে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার (ওয়াটার রিটেনশন পন্ড) ভরাট এবং একসময়ের উন্মুক্ত ‘প্লাবন পন্থা’ বাদ দিয়ে কৃত্রিম ‘বেষ্টনী পন্থা’ বা বেড়িবাঁধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ খালগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বৃষ্টিজনিত অতিরিক্ত পানি আর নদীতে গিয়ে পড়তে পারছে না। একইসঙ্গে, ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনে বিভক্ত হওয়ার পর সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নীতি ও পরিকল্পনাগত সমন্বয়হীনতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক জলপথ আটকে কৃত্রিম নর্দমা বানানোর এই মাশুল আজ গুনতে হচ্ছে ঢাকার দুই কোটি বাসিন্দাকে। পাম্প দিয়ে তাৎক্ষণিক পানি সেচে জলাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা কেবলই সাময়িক মলম; সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত ভুলগুলো স্বীকার করে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব পথ ফিরিয়ে দেয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা স্থায়ী জলাধার সংরক্ষণে ব্যর্থতা, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে বিভক্ত করার পর তৈরি হওয়া সংস্থাসমূহের মধ্যকার মারাত্মক সমন্বয়হীনতা ঢাকাকে আজ এক অকার্যকর ও জলাবদ্ধ নগরীতে পরিণত করেছে।

কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনি ছিল রাসেল স্কয়ার হয়ে ধানমন্ডি খাল বা রাসেল ক্যানাল। তবে তথাকথিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করে আজকের পান্থপথ সড়ক তৈরি করা হয়। একইভাবে সেগুনবাগিচা খালের স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করে সেখানেও তৈরি হয় কালভার্ট ও রাস্তা।

সাময়িকভাবে ওপরে রাস্তা চওড়া হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় পানির উন্মুক্ত প্রবাহ। কালভার্টের ভেতরে তৈরি হওয়া আবদ্ধ অন্ধকার অংশে বছরের পর বছর ধরে প্লাস্টিক, মাটি ও কঠিন বর্জ্য জমে পানির স্বাভাবিক গতিপথ একেবারে সংকৃচিত হয়ে পড়েছে। খোলা খাল না থাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পক্ষেও এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব। একসময়ের প্রমত্তা খালগুলো আজ মাটির নিচে অন্ধকার সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে পুরোপুরি মৃত প্রায়। যেসব খাল একসময় স্বচ্ছ পানির ধারা বহন করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা বালু নদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করত, সেগুলো আজ নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা ও প্রভাবশালী মহলের আগ্রাসনে কেবল কাগজে-কলমে টিকে আছে।

কল্যাণপুর খাল: একসময় নৌকা চললেও বর্তমানে দুই পাড়ে বর্জ্য ফেলে গভীরতা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। পরে দখলদারিত্বের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে বস্তি ও স্থায়ী বহুতল ভবন। জিরানী ও দেবধোলাই খাল: খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার এই খাল দুটি ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হতে হতে সরু নালায় রূপ নিয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আজ পুরো মিরপুর, কল্যাণপুর, খিলগাঁও, বাসাবো ও শ্যামলী এলাকা থইথই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে বিদেশি পরামর্শকদের দেয়া ‘বেষ্টনী পন্থা’ মেনে বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে নদীগুলো থেকে শহরের অভ্যন্তরীণ প্লাবনভূমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রায় ৫০টি সংযোগ খাল আজ মৃত বা মুমূর্ষু। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর তড়িঘড়ি করে নির্মিত ‘বৃহত্তর ঢাকা পশ্চিম তীর বাঁধ’ ধানমন্ডি লেক ও হাতিরঝিলের মতো জলাশয়গুলোর নদী-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

এ ছাড়া ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী রাজধানীতে পাঁচটি বড় ওয়াটার রিটেনশন পন্ড (জলধারণ এলাকা) সংরক্ষণের কথা থাকলেও কল্যাণপুরসহ প্রায় প্রতিটি জলাধারই এখন দখল ও স্থাপনা নির্মাণের শিকার।

২০১১ সালে ঢাকাকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি কর্পোরেশনে বিভক্ত করার পর থেকে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরণের সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। ওয়াসাসহ অন্যান্য সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে যেকোনো যৌথ সিদ্ধান্তের জন্য দুই সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে আলাদাভাবে সমন্বয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এক কর্পোরেশন অন্যটির উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ডেটা সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে থাকে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-এর (বিআইপি) সভাপতি আরিফুর রহমান তুষার বলেন, ‘ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার মূল কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ঢাকা শহরে প্রচুর খাল এখন বিলীন হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বা সম্প্রসারণের কারণেই বিদ্যমান ড্রেনেজ সিস্টেম সার্ভিস দিতে পারছে না। অ্যাডহক বা লোক দেখানো প্রকল্প না নিয়ে সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, দুই কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আশ্রয়স্থল। কৃত্রিম পাম্প দিয়ে সেচে জলাবদ্ধতা দূর করার প্রক্রিয়া মোটেও স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। নগরীকে বাসযোগ্য রাখতে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি— জলাধার পুনরুদ্ধার: ড্যাপ নির্ধারিত ওয়াটার রিটেনশন পন্ডগুলো অবিলম্বে দখলমুক্ত ও খনন করা। বক্স কালভার্ট ও খাল উন্মুক্তকরণ: কালভার্টের নিচে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করে সম্ভব হলে খালের উন্মুক্ত প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। সমন্বিত ব্যবস্থাপনা: ঢাকাকে একক সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে এনে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা।

সর্বোপরি, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো প্রকৃতিসৃষ্ট দুর্যোগ নয়; এটি বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণের ফসল। ইট-কংক্রিটের ফাঁদে আটকে পড়া খাল ও নদীগুলোকে তাদের স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে না দিলে সামান্য বৃষ্টিতেই অচল হয়ে পড়ার এই দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীর মুক্তি নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কেবল মেগা প্রকল্প বা তাৎক্ষণিক লোক দেখানো পদক্ষেপ নয় প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই পারে দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরকে এক অনিশ্চিত মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।

Link copied!