বিশেষ প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫, ০২:৫৬ পিএম
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর ব্যস্ততম সাতরাস্তা মোড় অবরোধ করে আন্দোলনে নামে কারিগরি শিক্ষার্থীরা। চার দফা দাবি আদায়ে তারা আন্দোলন করছে কয়েক ঘণ্টা ধরে।
আন্দোলনের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তেজগাঁও, ফার্মগেট, মহাখালী, গুলশান ও হাতিরঝিল এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ে সাধারণ মানুষ, অফিসগামী কর্মজীবী, অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার গাড়িও। এতে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি
কারিগরি ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ব্যানারে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা তাদের চার দফা দাবির কথা তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো— প্রকৌশল অধিকার আন্দোলনের পক্ষ থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দেওয়া প্রকাশ্য হত্যার হুমকির দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের অযৌক্তিক তিন দফা দাবির পক্ষে পরিচালিত সব কার্যক্রম রাষ্ট্র কর্তৃক অবিলম্বে বন্ধ করা।
কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির রূপরেখা ও সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা।
ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ান চ্যানেল এডুকেশন কার্যক্রম চালু করা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস ও প্রকৌশল কর্মক্ষেত্র কুক্ষিগত করার চক্রান্ত চলছে। আমরা বারবার আলোচনার চেষ্টা করেছি। সরকার যদি আমাদের দাবি পূরণে উদ্যোগ না নেয়, আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
রাজধানীতে যানজটে চরম অবস্থা
অবরোধের কারণে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকা, বিজি প্রেস মোড়, ফার্মগেট, মহাখালী, গুলশান, বনানী, হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। সকাল থেকে অফিসগামী মানুষ গাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকেন। অনেকেই বিকল্প পথ ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও সেখানে গাড়ির চাপ এত বেশি ছিল যে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। ফলস্বরূপ সরকারি-বেসরকারি অফিসে উপস্থিতি ব্যাহত হয়, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে।
একজন অফিসগামী ভুক্তভোগী জানান, ‘‘সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেট যেতে যেখানে ১০ মিনিট লাগার কথা, আজ সেখানে এক ঘন্টার বেশি সময় লেগেছে।’
এক অ্যাম্বুলেন্সের চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমাদের রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। কিন্তু যানজটের কারণে গাড়ি এগোতেই পারছিল না।’’
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্দোলন করা গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও রাস্তায় নেমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা সঠিক সমাধান নয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘একটি দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় অবরোধ তৈরি করলে লাখো মানুষের সময় নষ্ট হয়, জ্বালানির অপচয় হয়, অর্থনীতির ক্ষতি হয়। যানজটের কারণে অফিসগামী মানুষ তাদের কর্মস্থলে দেরিতে পৌঁছায়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা ব্যাহত হলে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই দাবি আদায়ের জন্য বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি।’’
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারিগরি শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মর্যাদা, চাকরির সুযোগ এবং প্রকৌশল ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একাধিকবার আন্দোলনে নামে। তারা অভিযোগ করেন, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতি অবমূল্যায়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে এ চার দফা দাবি উত্থাপিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এ সমস্যার সমাধানে বসতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি যুক্তিসঙ্গত হলে তা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করতে হবে। একই সঙ্গে রাস্তায় আন্দোলনের পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানী ড. রুবিনা সুলতানা বলেন, ‘‘প্রতিবাদ করার জন্য শান্তিপূর্ণ সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ অনেক গণতান্ত্রিক উপায় রয়েছে। রাস্তায় নেমে যানজট সৃষ্টি করা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। আমাদের দেশে আইনের মাধ্যমে জনসমাবেশের সুনির্দিষ্ট নীতি থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় না।”
উল্লেখ্য, কারিগরি শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের প্রকৌশল শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের জন্য তা নিয়ে সংলাপ প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের আন্দোলনের কারণে রাজধানীর যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়লে লাখো মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ক্ষোভ তৈরি করে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতি আহ্বান থাকবে, দ্রুত আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সুনির্দিষ্ট নীতি ও বিকল্প আন্দোলনের পথ তৈরি করা।
এইচআর/ইএইচ