ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ধ্বংসের মুখে ৩ লাখ কোটি টাকার স্পিনিং শিল্প: বন্ড সুবিধা ও ‘অদৃশ্য ইশারা’র মরণ কামড়

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

ধ্বংসের মুখে ৩ লাখ কোটি টাকার স্পিনিং শিল্প: বন্ড সুবিধা ও ‘অদৃশ্য ইশারা’র মরণ কামড়

বাংলাদেশের পোশাক খাতের শক্তির মূল উৎস হলো এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা স্পিনিং মিলগুলো। দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড়ের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয় এই স্থানীয় শিল্প। কিন্তু বর্তমানে এই ‘ইকোনমিক হার্টবিট’ বা অর্থনীতির স্পন্দন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের বেসরকারি খাতের একক বৃহত্তম বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও, কেবল ভুল নীতি আর কিছু অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে স্পিনিং মিলগুলো এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে।

দেশের টেক্সটাইল মিলগুলোর গুদামে বর্তমানে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের অবিক্রিত সুতা। এই বিশাল অংকের মূলধন আটকে থাকায় মিল মালিকরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, এমনকি দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ব্যবস্থায়। গত কয়েক মাসে দেশের প্রায় ৬০টি বড় বড় স্পিনিং কারখানা তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বস্ত্রখাতের এই সংকটের মূলে রয়েছে ‘বন্ড সুবিধা’র অবাধ অপব্যবহার। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য বন্ড সুবিধা দেওয়া হলেও, একটি বড় অংশ সুতা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে কৌশলে স্থানীয় খোলাবাজারে (কালোবাজার) বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, এই শুল্কমুক্ত বিদেশি সুতা যখন স্থানীয় বাজারে চলে আসে, তখন দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। কারণ দেশীয় মিলগুলোকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাঁচামাল আমদানি এবং শ্রমিকের মজুরিতে বিশাল অংকের কর ও ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে বিদেশি ‘বন্ডের সুতা’র দাম দেশীয় সুতার চেয়ে অনেক কম হয়ে যায়, যা স্থানীয় বাজারকে সম্পূর্ণভাবে দখল করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের স্পিনিং খাতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ, বিশেষ করে ভারত। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে ৩০ কাউন্টের এক কেজি সুতা উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২.৯৩ ডলার। বিপরীতে বাংলাদেশের মিলগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে এই উৎপাদন খরচ মাত্র ২.৮৫ ডলার। অর্থাৎ, উৎপাদন সক্ষমতায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও বিপণনে হেরে যাচ্ছে।

এর কারণ হলো প্রতিবেশী দেশের সরকারি নীতি। ভারত সরকার তাদের বস্ত্র রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান করে। এই সুবিধার কারণে তারা তাদের পণ্যের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে বাংলাদেশে ‘ডাম্পিং’ করছে। অর্থাৎ, নিজ দেশের বাজারমূল্যের চেয়েও কম দামে তারা বাংলাদেশে সুতা পাঠাচ্ছে, যাতে এদেশের স্থানীয় শিল্প একসময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। বিটিএমএ-র পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজিব হায়দারের মতে, প্রতিবেশী দেশ তাদের মোট সুতা রপ্তানির প্রায় ৪৮ শতাংশই বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। এটি একটি সুপরিকল্পিত ছক, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে সুতার জন্য আমদানিনির্ভর করে তোলা।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদি আজ স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর সুতার জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যখন দেশে কোনো বিকল্প বা প্রতিযোগী স্থানীয় শিল্প অবশিষ্ট থাকবে না, তখন ওই দেশগুলো একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করবে এবং সুতার দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। তখন আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত সেই আমদানিকৃত সুতার চড়া দামের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জিডিপি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসের জন্য এক আত্মঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করবে।

স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় সুতায় বন্ড সুবিধা বাতিল করার জন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন জোরালো সুপারিশ করেছে। এমনকি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এই সুপারিশ কার্যকরের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, কিসের টানে বা কার ইশারায় এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না? ডিবন্ডিং বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করলে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ তারা শুল্ক দিয়ে সুতা আমদানি করে পণ্য রপ্তানির পর পুনরায় সেই শুল্ক ফেরত (Duty Drawback) পাবেন। সমস্যা হবে কেবল সেই সিন্ডিকেটের, যারা বন্ডের সুতা এনে স্থানীয় বাজারে কালোবাজারি করে। তবে কি সেই কালোবাজারি সিন্ডিকেট সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চেয়েও শক্তিশালী?

বিটিএমএ সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান মনে করেন, স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তার মতে, গত দুই বছর ধরে আমরা লোকসানে সুতা বিক্রি করছি। মিলগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা সরকারকে বারবার বলছি সমাধানের জন্য, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

ডিবন্ডিং কার্যকর করা: যে সব কাউন্টের সুতা দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদিত হয়, সেগুলোর বন্ড সুবিধা দ্রুত বাতিল করা।

কালোবাজারি রোধ: বন্ডের সুতা যাতে খোলাবাজারে আসতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও এনবিআর-এর বিশেষ অভিযান।

জ্বালানি নিরাপত্তা: স্পিনিং মিলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

আর্থিক সহায়তা: সংকটে পড়া মিলগুলোর ব্যাংক ঋণের কিস্তি পুনঃতফসিলীকরণ এবং কম সুদে চলতি মূলধনের জোগান দেওয়া।

স্পিনিং শিল্প কেবল একটি ব্যবসা নয়, এটি বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অংশ। ৩ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল খাতকে যদি কেবল বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আর ডাম্পিং পলিসির কাছে বলি দেওয়া হয়, তবে এর খেসারত দিতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে। ‘অদৃশ্য ইশারা’র জাল ছিঁড়ে সরকারকে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি সুতার অভাবে বৈশ্বিক বাজারে তার জৌলুস হারাবে।

এএন

Link copied!